আমার স্মৃতির ক্যাম্পাস
প্রীতির এলবাম।
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী ।
**
(লেখাটি ‘চিটাগং ইউনিভার্সিটি এক্স-স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন ইন ইউ’ র ম্যাগাজিনের জন্য লেখা)।
**
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে স্মৃতি মূলক কিছু লেখার জন্য কলম ধরি আর রাখি। আজ লিখব, কাল বসব করে করে অনেক দিন হয়ে গেছে, লেখা হয়না, কলম যেন চলেনা। এত স্মৃতির এত প্রীতির ক্যাম্পাস, কোথা থেকে শুরু করি কোথায় গিয়ে শেষ করি-বলা যায় এ ভাবনাই আমার দুশ্চিন্তার কারণ ।
1984 থেকে 1989. দীর্ঘ ছয় বছরের ক্যাম্পাস। অনার্স থেকে এম এ। সেশন জট। পরীক্ষা না দিয়ে নাটকে অভিনয় করার জন্য ঢাকায় গমন, রেগডে তে তিনটি দলের হয়ে বাউল বেশে গান গাওয়া, রূশিয়ান ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি, চট্টগ্রাম ভার্সিটি রিক্সা চালক সমিতির মারেফতি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন, রিকশা ওয়ালাকে বসিয়ে নিজে রিকশা চালানো, ভিসি বিরোধী আন্দোলন, একই দিনে কামিল ও সাবসিড়িয়ারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করা, (বলাবাহুল্য, আমি ’88 সালে রাঙ্গুনীয়ার আলমশাহ পাড়া আলীয়া মাদ্রাসায় কামিল পরীক্ষা দিয়ে মোটরসাইকেলে করে পঁচিশ মাইলের মত বৃষ্টিভেজা কাদাময় পথ মাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সমাজতত্ত্বের সাবসিড়িয়ারি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম, লেখার সময় পেয়েছিলাম এক ঘন্টার মত)। ভার্সিটি বন্ধ, হলে হলে আক্রমন, নিজের রুমে এনে নিরাপরাধ ছাত্রদের নিরাপত্তা প্রদান, সকাল হবার আগেই আর্থিক সহায়তা সহ বাড়ির উদ্দেশ্যে তাদের ট্রেনে তুলে দেয়ার মত অনেক অনেক কথা আজ আমাকে গর্বিত করে। আমাকে আন্দোলিত করে, যখন দেখি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতার সত্তর ভাগ পুরস্কার আমার দখলে। পুরস্কার গ্রহন করেছিলাম সম্মানিত ভিসি, বিশ্বখ্যাত গানিতিক ড. জামাল নজরুল সহ অনেক অনেক সম্মানিত শিক্ষকের হাত থেকে। স্মৃতির পাতা থেকে কখনো হেরে যাবে না ভার্সিটির ক্যাম্পাসে করা আমার গানের রেকর্ডিংএর দৃশ্য এবং বাংলাসাহিত্যের প্রধান আধুনিক কবি আল মাহমুদের উপস্থিতিতে ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ এর সাহিত্য বিষয়ক সেমিনারে সাত সাগরের মাঝি গ্রন্থের উপর আমার আবৃত্তি ও আলোচনার কথা।
(পাঠক, ইউটিউবে “surkawsar” ক্লিক করলে আমার লেখা এবং গাওয়া 14টি গান শুনতে পারবেন)।
সারা জীবন মনে থাকবে 2008 সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আমাকে দেয়া সংবর্ধনার অমলিন অম্লান স্মৃতির কথা। একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দেয়া এই সংবর্ধনা ছিল আমার জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি। সে দিন আমি আমার লেখা ও সুর করা একটি গান গেয়েছিলাম যা ‘আরবি বিভাগীয় সঙ্গীত’ নামে গীত ও সমাদৃত । আমার সব চেয়ে বড়ো বেশি পাওনা ছিল যে, আমি ফুল এবং ক্রেস্ট গ্রহন করেছিলাম আমার বড় মেয়ে অক্ষর, বড় ভাই জাহেদ, ছোট ভাই কিবরিয়া, প্রিয় শিক্ষক ও কয়েকজন জুনিয়র বন্ধু-যারা বর্তমানে ভার্সিটির শিক্ষক তাদের সামনে তাদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহন করেছিলাম বলে। কারণ, এরা এই প্রথম দেখল আমার সামাজিক অবস্থান।
শিক্ষকদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। আমার কাছে কোনদিন জাতিভেদ ছিল না। ছিলনা সিনিয়র জুনিয়রের ময়লাময় দেয়াল। আমার বন্ধুদের মধ্যে এখন অনেকেই বিভিন্ন ভার্সিটির শিক্ষক, প্রভোস্ট বা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছে। বর্তমান চবি’র শিক্ষক সমিতির সভাপতি আমার জুনিয়র বন্ধুদের একজন। অবশ্য, সম্পর্কে সে আমার খালাতো ভাই। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রোভিসি আলী হায়দার খান তখন আমার পাশের রুমে থাকতেন। তিনি তখন কানাডার বৃত্তি নিয়ে এম ফিল করছিলেন। একেবারেই ঘর মুখো, বই খেকো মানুষ, তিনিও আমাকে সময় দিতেন, ডেকে নিয়ে আমার গান কবিতা শুনতেন। মনে হয় তাঁদের দোয়া এবং ভালবাসার বদৌলতে লন্ডনে এসে আজ আমি পিএইচডির স্বপ্ন দেখছি।
আজ থেকে 32 বছরের পুরনো স্মৃতি। সময়ের বিচারে সে বহ দিন। স্মৃতির স্মরণে মনে হচ্ছে ঐ ত গতকালের যেন। মনে হচ্ছে ক্যাম্পাসে বসেই এই লেখাটি রচনা করছি। লিখেছি অসংখ্য অগণিত অমর অম্লান মধুর বিধুর কথা যা আমাকে করছে আপ্লুত ও রোমাঞ্চিত। স্মৃতিগুলি যেন প্রতিযোগীতা করছে প্রকাশ পাবার জন্য।
আমার স্বপ্নেও ছিলনা যে আমি ভার্সিটিতে পড়াশুনা করব।এগারো বছর বয়সে অভিমান করে ঘর ছাড়ি। সুদূর মারিশ্যা। অনুন্নত পরিবেশ। গ্রাম থেকে দূরে, বহু দূরে। একেবারেই অজানা অচেনা পরিবেশ। তাও ক্লাস পলাতক ছাত্র। তারপর রাঙ্গুনীয়ার ইছামতীর পাড়ে, ঠান্ডাছড়ি চা বাগানের কোন ছায়ায় , আমার প্রিয় শিক্ষক আবদুল মোনাফের স্নেহঘেরা ঘর, মাস্টার ইউনুস সাহেবের শিরিন- সিক্ত বাগান, জুরেরকুলের গুরা মিয়া’র বাড়ি বা প্রশস্ত কোন মাঠে বসে বসে ছড়া কবিতা লেখা, হিন্দু -বুদ্ধ মন্দিরে কবিতা আবৃত্তি বা বক্তৃতা দিয়ে দিন অতিবাহিত করাই ছিল আমার কাজ। এ পথে আমি পেয়েছি প্রচুর, হারিয়েছি অনেক।
একেবারেই ভুল করে, ভুল বিষয়ে, পৃথিবীর সুন্দর একটি সাহিত্য নিয়ে চবি তে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেই। এক বন্ধুর কাছে শুনলাম পাশ করেছি। চেয়েছিলাম বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশুনা করব। হয় নি। সাবসিড়িয়ারি ছিল ইসলামের ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব।
ভার্সিটিতে ভর্তির পর অবশ্য আমি সম্পূর্ণ রূপে বদলে যাই। নিয়মিত ক্লাস করা সহ সর্বার্থে আমি একজন ভাল ও সংস্কৃতির আদর্শ ছাত্র হিসেবে শুধু আমার ডিপার্টমেন্টে নয় পুরো ক্যাম্পাসে পরিচিত হয়ে উঠি।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাটক, কবিতা, জারী কি সারী সব কিছুতেই আমার সম্পৃক্ততা ছিল পুরোভাগে। কলা ভবনের সামনে বাউল বেশে আমি অনেকবার গান গেয়েছি। 89’র রেগডে তে আমি নগর কমিটি, আলাওল হল কমিটি এবং রাউজান ছাত্র কল্যাণ সমিতির পক্ষে তিন তিনবার মঞ্চে উঠে গান পরিবেশন করি।
আমার নগর কমিটির জার্সিতে লেখা ছিল “ডাইলের মজা তলে/ তোমার মজা গালে”। আমার লেখা এবং গাওয়া বিখ্যাত গানগুলি ছিল যেমন, ” মামু জবাব দেন/ ভার্সিটিটা বন্ধ দিলেন ক্যান”। ” শাটল ট্রেনের জানালায় বসে/ পথ চেয়ে রই তোমার আশে “। জারী গান-যেমন, মরি হায় রে হায় / লজ্জায় পরান যায় /
অমুক মিয়া পুরান গিলটি, তমুকের জামাই,” “মরে গেলাম/ প্রেম হারালাম/ সেশনের জ্বালায়” এবং বিখ্যাত ছড়াটি ছিল, ” সেশন জট হলে ভাল লাগে/ খুশি লাগে মনে / প্রতি বছর প্রেম করা যায়/ নতুন সখির সনে”। ইত্যাদি। বন্ধুরা আমাকে দেখলেই গানগুলি গাইত বা গানের প্রথম লাইন দিয়ে আমাকে চিনত বা ডাকত। ভার্সিটিতে আমার ডাক নাম ছিল ‘সাগর’ ভাই এবং কারো কারো কাছে ‘কবি’ ভাই বলে। তখন আমি আমার লেখালেখিতে ‘সাগর সাহারা’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতাম।
ভার্সিটির স্মৃতি এবং আনন্দের কথা লিখে শেষ করার মত নয়। ভার্সিটির মজা অনার্সে। পাসকোর্সের এম এ তেমন সুস্বাদু নয়। অনার্স ছাড়া ভার্সিটিকে বুঝা যায় না, বুঝা যায় না জ্ঞানের সংজ্ঞাকেও। এই অনার্সের সময়টাতেই আমি রচনা করি দুটি বাংলা- ইংরেজী অভিধান, একটি গান ও গজলের বই এবং বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ।
থাকতাম আলাওল হলের 401 নং রুমে। একা রুম। সুন্দর পরিপাটি পরিবেশে আমি খেয়ে ঘুমিয়ে জীবন নষ্ট করিনি।’গাংচিল সাহিত্য সংসদ’ নামে আমার প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সংগঠনের পক্ষে বের করতাম বিশ পয়সা মূল্যের মাসিক ছড়াপত্র ‘ হৃদয়ে অক্টোপাস’ ও ত্রৈমাসিক দেয়াল পত্রিকা ‘মা’। উল্লেখ্য, আমার 11 বছর বয়স থেকেই “মা” নামে আমি একটি পারিবারিক দেয়ালিকা বের করতাম। আমার প্রথম কবিতার নাম ‘বসন্ত বাতাস ‘, লিখেছিলাম সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায়।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, অস্টাশি সালে এম এ ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে নাটক করতে চলে যাই ঢাকায়। নাটকের নাম ছিল ‘সুবর্ণ পুরের সুবর্ণ দিন’। এ নাটকে আমি দুটি চরিত্রে অভিনয় করি।
পরীক্ষা ড্রপ দিয়েছিলাম মূলতই ভার্সিটিতে আরো কয়েকটি বছর থেকে যাবার জন্য। এ জন্য আমার সেজ ভাই কাদের ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে আমাকে বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। মা চির বিদায় নেন 1986 সালে। আমি তখন অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তখন বাড়িতে আসা যাওয়া কম করে একটি লিবিয়ান এনজিওতে কাজ শুরু করি। পোস্ট, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রজেক্ট অফিসার। জীবনের শুরু। সুযোগ আসে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর। এখান থেকে কষ্টকে আনন্দে রূপান্তরিত করার কৌশল আয়ত্ত করি। বলা যায়, এ পথেই আমি আমাকে পেয়েছিলাম। পেয়েছি।
ভার্সিটি আমার কাছে কেমন ছিল তা কলম বা ভাষণ দিয়ে বুঝানো অসম্ভব। এ প্রবন্ধ প্রথম বিভাগ প্রাপ্তদের জন্য নয়। তাঁরা অনেকেই ভার্সিটিকে দেখেন নি। তাঁদের সাথে ফ্যাকলটির লতা, পাতা,ঘাস, গুল্ম, পিঁপড়া ও ফড়িং এর সাথে পরিচয় নেই। যদিও এদের কেউ কেউ দ্বিতীয় তৃতীয়ের নোট নিয়ে চলত।
রেগডে’র পরের দিন আমি একা একা ভার্সিটির অলিতে গলিতে হেঁটেছি। খেলার মাঠ, গাছের পাতা, পাখি, আর্ট ফ্যাকালটির কৃষ্ণচূড়ার সাথে আমি একান্ত কথা বলেছি। গুমরে গুমরে কেঁদেছি। প্রায় সময় সহপাঠী, খেলার সাথী, হল ও ক্যাম্পাসের বন্ধু, নাট্য কর্মী, সঙ্গীত শিল্পী, ও কলমি সহযোদ্ধাদের কথা পড়ে। তোমাদের চিঠি, ছবি, অটোগ্রাফ এখনো আমি হারাই নি।
আজ মনে পড়ে সব কথা। সব সুখময় ব্যথা। স্মৃতিময় জীবন্ত ইতিহাসের স্বর্ণালী পাতা।
উড়ন্ত পাখি, ঘর হারা ছাত্র, মা হারা ছেলে বলে অনেকের ভালো লাগা, চোখের স্পষ্ট ভাষা, ফুল ও পত্রের মর্যাদা দিতে পারি নি,সাহস করিনি, সময় পাইনি।
আজ সে সব রোমন্থন করে মাঝে মধ্যে নিজেকে অবিবেচক ভাবি। তবে, ভাল লাগে যখন শুনি তোমরা অনেক অনেক ভাল আছ। প্রত্যাশা করি, তোমরা ভাল থেক চিরকাল।
আমার প্রিয়া ভার্সিটি!
তুমি আমার বিরহ অসহ দহের সুখ স্মৃতির ঠিকানা,
অমলিন অম্লান অজস্র ফুলের
পাপড়ি সিক্ত
শোভাময় মঞ্জরিত মোহনা,
তোমার আমার মিলন অনন্ত
অপার
এ বিচ্ছেদ কতই না মধুর বিধুর
মিলনের শিহরণ জাগে বার বার!
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী
(সাগর সাহারা)।
সেশন-1984-’85 ইংরেজি।





Discussion about this post