ইউরোপে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে
– ইউনুছ ইবনে জয়নাল
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক প্রাণি। মানুষকে সমাজে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়। সমাজের কথা মত চলতে হয়। সমাজে এক জন যা ইচ্ছে তা করতে পারেনা। সমাজে সবার সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য যেমন আছে তেমনি আছে সমান অধিকার। একজনের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করতে গিয়ে অন্য জনের অধিকার হরণ করার নীতি, আকাঙ্খা, জিঘাংসা থাকতে পারেনা তা’ই জানতে, শিখতে এবং দেখতে পেলাম ইউরোপের তথা লন্ডনের পরিবেশে।
আর- যা জানার, শেখার, দেখার, মানার এবং থাকার কথা নয়, সামাজিক পরিবেশে অসামাজিক কাজ, সমাজের কথা যেখানে মুল্যহীন, ব্যক্তির কথায় যেখানে সমাজ কান ধরে উঠাবসা করে, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যের অধিকার হরণে মহোৎসব চলে, নীতির শরীর থেকে আদর্শের পোষাক টেনে হেঁচড়ে খুলে দুর্নীতির পোষাকে আবৃত করে ভদ্রতা রক্ষার শপথে দু’ফোটা মায়া কাঁন্নার অশ্রুজল বিসর্জন দেওয়া হয় সেখানে-
দুর্ভাগ্যে দুঃখ জনক হলেও বাস্তবে আমার বসবাস..!!!
আর এ কঠিন পাথরসম সত্য প্রতিয়মান হয়েছে আমার পরিবেশে আমার জীবনের সময় গুলোতে একাংশে। সাদৃশ্যে মুখোমুখি অবস্থাপূর্ণ তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে আপনার লেখনিতে। তাই-
পাগলপারা বাহবা নয়! প্রকৃতপক্ষে-
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম হাবিবী,
(Nazrul Habibi) স্যার আপনার লেখনি যথার্থ! অনেক অনেক সুন্দর সাদৃশ্য পূর্ণ তত্ত্ব ও তথ্যে ভরপুর একটি প্রবন্ধ। যুগোপযোগি শিক্ষণীয় বিষয়। যা থেকে শিক্ষা নিয়ে মেনে চলে আমরাও আমাদেরকে পরিণত করতে পারি উন্নত জাতিতে। উন্নত পরিবেশে করতে পারি বসবাস। যেখানে ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন হবে বড়ই সুখ ও শান্তিময় এবং পারস্পারিক সম্মান জনক..!!!
আপনার-
এমন লেখনির জন্য আপনাকে সালাম জানাই হাজার বার। আপনার সাফল্যময় জীবন এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি। বাংলার জন্য, বাংলা ভাষার জন্য কর্মের মাঝে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলতে থাকুন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে…
– সভাপতি
কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন
বগুড়া জেলা শাখা
——————————-(মূল প্রবন্ধ নিন্মে প্রদত্ত হল)
ইউরোপে বাংলাদেশ
নজরুল ইসলাম হাবিবী
**
ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ থেকে দুই সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ডের স্কুল কলেজ বন্ধ। খৃষ্টানদের বড় দিন । শনি ও রবিবার আমি একটি বাংলা স্কুলে শিক্ষকতা করি বিধায় বাইরে যাওয়া হয় না। স্কুলটি আমার বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে। নাম ‘বাংলাদেশ কালচারাল সোসাইটি স্কুল’। আমরা এখানে বাংলার পাশাপাশি আবৃত্তি ও গান শেখাই। এ ধরণের স্কুলের জন্য স্থানীয় সরকার (বরা) আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। আমার নিজেরও ছোটখাটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। যার কারণে, শনি ও রবিবার এখানে ছুটি হলেও আমার বেড়ে যায় ব্যস্ততা।
ছেলে এবং স্ত্রী অসুস্থ। বাসার অনেক কাজ আমাকে করতে হয়। এ দেশে বাসা-বাড়িতে কাজের ছেলেমেয়ে রাখা শতকরা ৯০ জনের পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি একটি কলেজে কাজ করি এবং পিএইচডির স্বপ্ন নিয়ে অক্সফোর্ডে যাই। এ সব কারণেও লন্ডনের এই প্রবাস জীবন আমার কাছে অনেকটা কঠিন। কেননা, কাজ, পড়ালেখা, সাহিত্য ও সামাজিকতার চাপ এক সাথে বয়ে নেবার মত শক্তি আমার নেই। এখানে অনেক কষ্ট, যা হয়ত বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। তারপরও যথাসাধ্য জীবনকে উপভোগ করার চেষ্টা করি।
আজ লন্ডনের মেঘমুক্ত আকাশ আমাকে যেন বাউল করে তুলছে। সুন্দর আবহাওয়া। গাছে মুকুলিত হচ্ছে কিশলয়, ভেতরে ভেতরে রেণু-পরাগের লুকোচুরি অসম প্রেমের নতুন চিঠির মত।
ছেলেমেয়েকে নিয়ে পার্কে যাই। নাম ‘হারেঙ্গে সিভিক সেন্টার পার্ক’। উল্লেখ্য যে, এদেশের পার্কগুলি ছিমছাম পরিপাটি, সুন্দর, সাজানো-গুছানো। ছেলেমেদের বিনোদনের যাবতীয় সুব্যবস্থা এখানে করা থাকে।
লন্ডনে অনেকগুলি বড় ছোট পার্ক আছে। কিন্তু সুবিধাদি প্রদানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোন শ্রেণী-বিন্যাস করে না। এখানে জাত-গোষ্টির বিতর্ক নেই।
পার্কের ভেতর ফুলের বাগান, ফুটবল খেলার মাঠ, প্লাস্টিক বা লোহার চেয়ার-টেবিল খেলাধুলার নানান সরঞ্জামাদি দেখে মনে হবে আপনি কোন এক বিশেষ আবেষ্টনীর আবহে আছেন। আমি বলি, British park is for Think, Things and Sing. চিন্তা ভাবনা করার, অনেকগুলি মনোলোভা আয়োজন উপভোগ করার এবং মনের সুখে বসে গান করার মত নির্জন স্থান আর হয় না।
বসে থাকুন একা অথবা বন্ধুর কোলে, না, কারো কোন শ্যেনদৃষ্টি নেই। নেই মামা-মাতব্বরের রক্তচক্ষু।
কুকুরের বিষ্টা ফেলার আলাদা ব্যবস্থা, একটি কলা খেলে তার বাকলটি কোথায় ফেলবেন, কোন রঙের বোতল-গ্লাস, কাগজ (পাতলা-মোটা), টিনের বোতল, কাপড়-চোপড় কোথায় ফেলবেন তার জন্য নির্দিষ্ট ‘বিন’ বসানো আছে। ‘বিনে’র গায়ে লেখা থাকে, যদি কোন কারণে ‘বিন’ নষ্ট হয়, খোলা না যায় অথবা আবর্জনায় ভরে ওঠে, আপনি কাকে (ফ্রি) ফোন করবেন। লেখা থাকে, সপ্তাহের কোনদিন এবং কখন লরি এসে তা নিয়ে যাবে।
পার্কে কোন গার্ড বা পুলিশ নেই। পুলিশের ডান্ডা এবং নেতা, পাতি নেতা, সিকি নেতার কিল-ঘুষির কোন ভয় নেই, তারপরও সব আছে। মনে হয় আমাদের কেউ দেখছে। এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাদের শাসন করছে।
চকলেটের একটি ছোট কাগজও যেখানে সেখানে ফেলতে মন চায় না। অপরাধবোধ, লজ্জা, রীতি-নীতি, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা যেন বিবেক ধরে টানে।
পথে- ঘাটে কিছু ফেলা তো দূরের কথা, এদেশের মানুষ চলার পথে কোন কাগজ-ময়লা দেখলে তা নিজের হাতে তুলে নিয়ে নির্ধারিত ‘বিনে’ ফেলে আনন্দ লাভ করে।
আমাদের ঘরের বাইরের দরজা পর্যন্ত সরকারি দায়িত্বে সপ্তাহে একবার পরিস্কার করা হয়। এর পরও আমরা একটি শুষ্ক পাতাও উঠোনে পড়তে দেই না। নিজের হাতে যখন এ রকম কাজগুলি করতে পারি তখন আমাদের ভাল লাগে। মনে হয়, আজ একটি সুন্দর এবং সমাজ সেবামূলক কিছু করা হল।
আমার মনে পড়ে ২০০৬ সালের কথা। সেবার আমি দেশে গিয়েছিলাম। বিস্কেটের খালি একটি প্যাকেট এবং খালি একটি পানির বোতল কোনোখানে ফেলার জন্য ‘বিন’ না পাওয়ায় আমার ব্যাগে করে দীর্ঘক্ষণ পথ হেঁটেছি। আমার সাথে আমার কিছু বন্ধু-আত্মীয় ছিল। তারা জানতে চাইল কেন আমি সে সব ফেলছি না। বললাম, আমি একটি ‘বিন’ এর সন্ধান করছি। তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে জানতে চাইল আমি ঠিক মত আছি কিনা! হয়ত তাদের ধারণা, আমার মাথার কোন অংশে সমস্যা আছে। বন্ধুদের মধ্যে ভার্সিটিতে পড়ুয়া সরকারি বড় কর্মকর্তাও ছিল। সেই-ই এক ধরণের বিদ্রূপের ছলে বলল ‘ফেলে দে এখানে, এটা লন্ডন নয়’।
মনে পড়ে, বাংলাদেশে একদা এক মহিলাকে রাস্তায় ময়লা না ফেলার জন্য পরামর্শ দিতে গিয়ে স্থানীয় মাস্তানের রোষানলে পড়েছিলাম। মাস্তান জানতে চাইল ময়লা ফেলানোতে আমার সমস্যা কী? উত্তরে বলেছিলাম, “ময়লা-আবর্জনা আমার বুকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তাই আপত্তি করেছি “!
‘অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে/ কথা কয়ে যাও গোপনে গোপনে’। আজ থেকে চার বছর
আগের কথা।
ছেলেমেয়েদের সাথে এখন পার্কে। বিকাল বেলা। বাসায় ফিরতে হবে। গাছের মগডালে কয়েকটি পাখির কূজন। কিছু পাখি কোথায় যেন দূরে উড়ে যাচ্ছে। উমুক্ত পেখম উড়িয়ে, পবনে পবনে গগনের পথে।
মন বলে দেশে যাই। ফিরে যাই মা-বাবার কোলে, শাপলা জলে, শিমুল তলে, ঘাসের ঘ্রাণে, ঝিঁঝি ও ফড়িং এর গানের দেশ-আমার সোনার বাংলাদেশে।
আবেগ থেমে যায়। নিজেকে অপরাধী ভাবি। যদি বন্ধুদের বুঝাতে না পারি যে, বাংলাদেশ সুন্দর একটি দেশ, এ আমাদের মায়ের দেশ। আমরা মাকে যেমন ভালবাসি ঠিক তেমনি দেশকেও ভালবাসতে হবে, মা এর গায়ে একটি ধুলোও পড়তে দেব না, পড়লে হাত দিয়ে আদরে তা মুছে দেব। বলব, ‘মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’।-এটাই যে মাতৃভক্তি, দেশপ্রেম! না আর পারি না! বন্ধুরা আবার বলবে, ‘রাখ ও সব, তোর ময়লা ফেলে দে এখানে, এটি লন্ডন নয়’!
**
এক সময় লন্ডনের পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে আমি নিয়মিত লেখালেখি করতাম। এ লেখাটি এর একটি।
উল্লেখ্য যে, ‘ইউরোপে বাংলাদেশ’ শিরোনামে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী ও কালের কণ্ঠে আমি একদা কলাম লিখতাম।
ফেজবুকের কল্যাণে এত বছর পর লেখাটি পেয়ে শেয়ার করেছি মাত্র।
১১ এপ্রিল ২০১০
আমার লেখা “কথার নাম লতা” নামক গ্রন্থে লেখাটি সংযোজিত হয়েছে।





Discussion about this post