শাহেদ সরওয়ার :
পবিত্র শবে মে’রাজ—লাইলাতুল মে’রাজ—সেই নূরানি রজনী, যখন হাবিবুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (ﷺ) আরশে আজিমে উপস্থিত হয়ে উম্মাহর জন্য রহমত, নূর ও নৈকট্যের অমূল্য দান নিয়ে আসেন। এমনই বরকতময় সময়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার কাগতিয়ার কালজয়ী আরিফ-বিল্লাহ, খলিলুল্লাহ, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রাসুল (ﷺ) হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (রহ.)-এর পবিত্র বেছাল শরীফ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ফানা ফিল্লাহ থেকে বাক্বা বিল্লাহ পর্যন্ত এক পরিপূর্ণ রূহানি সফরের কথা।
নসব, জন্ম ও রূহানি প্রস্তুতি
হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (রহ.) ছিলেন আওলাদে মোস্তফা—নবীজি (ﷺ)-এর পবিত্র বংশধারার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এক পরহেজগার, তাকওয়াবান পরিবারে তাঁর জন্ম, যেখানে সকাল শুরু হতো যিকিরুল্লাহ দিয়ে এবং রাত শেষ হতো কান্নাভেজা মুনাজাতে। শৈশব থেকেই তাঁর কলবে বাসা বাঁধে খাশইয়াতুল্লাহ, মহব্বতে ইলাহি ও ইশকে রাসুল (ﷺ)। দুনিয়ার মোহ তাঁকে স্পর্শ করেনি; বরং খামোশি, মুরাকাবা ও নির্জন সাধনাই ছিল তাঁর প্রিয় সঙ্গী।
ইলমে জাহির থেকে মারিফাতুল্লাহ
তিনি ইলমে জাহির—কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনের পর প্রবেশ করেন ইলমে বাতিন তথা মারিফাতুল্লাহর ময়দানে। কামিল মুরশিদের সোহবতে থেকে দীর্ঘ রিয়াজত ও মুজাহাদার মাধ্যমে নফসে আম্মারা থেকে নফসে মুতমাইন্নার স্তরে উন্নীত হন। যিকিরে জেহরি ও খফি, ফিকির ও মুরাকাবার ধারায় তাঁর হৃদয় হয়ে ওঠে নূরে ইলাহিতে উদ্ভাসিত।
খলিফায়ে রাসুল (ﷺ)—আমানত ও দায়িত্ব
‘খলিফায়ে রাসুল’ হওয়া কোনো উপাধি নয়; এটি সুন্নাতে মুস্তফা (ﷺ)-এর আমানত বহনের গুরুদায়িত্ব। হযরত গাউছুল আজম (রহ.) এই আমানত বহন করেছেন তাওয়াজু, আদব ও খিদমতের মাধ্যমে। তাঁর চালচলন, কথাবার্তা ও নীরবতায় প্রতিফলিত হতো রাসুলে কারিম (ﷺ)-এর আদর্শ। তিনি মানুষকে নিজের দিকে নয়, বরং আল্লাহ ও রাসুল (ﷺ)-এর দিকে আহ্বান করতেন।
দাওয়াতে ইরশাদ ও তাজকিয়ায়ে নফস
তাঁর ইরশাদ ছিল হাল দ্বারা—কওলের চেয়েও গভীর। তিনি ভাঙা কলবকে শিফা দিতেন, গাফিল আত্মাকে যিকিরুল্লাহর মাধ্যমে জাগ্রত করতেন এবং কঠোর নফসকে বিনয় ও ইখলাসের পাঠ শেখাতেন। তাঁর বাণী ছিল—“নফসের ফনা ছাড়া রবের বাক্বা অর্জিত হয় না।” এই দাওয়াতেই অসংখ্য মানুষ হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়।
তাসাউফ, খিদমত ও হুসনে আখলাক
হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (রহ.)-এর তাসাউফ ছিল কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক। তাঁর কাছে সুফিবাদ মানে কারামত প্রদর্শন নয়; বরং সবর, শোকর, রিদা বিল ক্বদা, তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ ও মহব্বতে খালক। দরিদ্র, মিসকিন ও মজলুমের খিদমতে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন নিঃশর্তভাবে।
বেছাল শরীফ—আশিক ও মাশুকের মিলন
পবিত্র শবে মে’রাজের বরকতময় সময়েই তাঁর বেছাল শরীফ ছিল ফুরকাত নয়, বরং বিসাল—রবের দরবারে প্রত্যাবর্তন। দুনিয়ার চোখে তা বিদায় হলেও মালাকুতের জগতে ছিল নূরানি সংবর্ধনা। তাঁর জিসম মাটিতে সমর্পিত হলেও তাঁর রূহ আজও সালিকদের পথপ্রদর্শক, ফয়জের ঝরনাধারা হয়ে প্রবাহিত।
রূহানি উত্তরাধিকার ও চলমান ফয়জ
হযরত গাউছুল আজম (রহ.)-এর খানকাহ, সিলসিলা ও শিষ্যসমাজ আজও তাজকিয়ায়ে নফস ও ইস্লাহে উম্মাহর কাজে নিয়োজিত। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইশক, আদব ও নূরের উত্তরাধিকার—যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
ইয়া আল্লাহ! আমাদের কলবকে নূরে মারিফাতে আলোকিত করুন। হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (রহ.)-এর ইখলাস, তাকওয়া ও মহব্বতে রাসুল (ﷺ) আমাদের জীবনে নসিব করুন। পবিত্র শবে মে’রাজের বরকতে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে আ’লা মাকাম দান করুন এবং আমাদেরকে আউলিয়ায়ে কিরামের সোহবত ও আদব নসিব করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক,
সংযুক্ত আরব আমিরাত







Discussion about this post