কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর ব্যাপ্তির কোন সীমারেখাই নেই। আমাদের জয়জীবনের প্রতি মুহুর্তে, প্রতি পদেেপ রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক্কেবারে রাশভারী ছিলেন না। বরং বেশ রসিক ছিলেন। ২৫শে বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৯তম জন্ম-জয়ন্তীতে সেই রসবোধের কিছু কথা তো হতেই পারে-
একবার শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক নেপাল রায়কে রবীন্দ্রনাথ লিখে পাঠালেন আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এজন্য কাল বিকেলে আমার এখানে এসে আপনাকে দন্ড নিতে হবে। এ কথা শুনে চিন্তিত নেপালবাবু পরের দিন কবির কাছে উপস্থিত হলেন। আগের রাতে দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমাতেও পারেননি। তারপরও তাঁকে বেশ কিছুণ চিন্তার মধ্যেই বসিয়ে রেখেছেন কবিগুরু। অবশেষে একটি মোটা লাঠি হাতে এলেন কবি। নেপালবাবুর তখন ভয়ে কান্ডজ্ঞান লুপ্তপ্রায়। তিনি ভাবলেন সত্যিই বুঝি লাঠি তাঁর মাথায় পড়বে। কবি সেটা বাড়িয়ে ধরে বললেন এই নিন আপনার দন্ড। সেদিন যে এখানে ফেলে গেছেন তা একদম ভুলে গেছেন। বিসর্জন নাটকের রিহার্সাল জোড়াসাঁকো ঠাকুরাড়ীতে হতো। রবীন্দ্রনাথ করতেন জয়সিংহ, আর দিনু মানে দীনেন্দ্রনাথ করতেন রঘুপতি। দীনেন্দ্রনাথ ছিলেন মোটা। রিহার্সাল চলাকালীন একটি দৃশ্য ছিল রঘুপতি মৃত জয়সিংহের উপর আছাড় খেয়ে পড়বে। রিহার্সাল শেষ হলে রবীন্দ্রনাথ বিচিত্র ভঙ্গীতে দীনেন্দ্রনাথ এর দিকে তাকিয়ে বলতেন দিনু ভুলে যায় যে আমি বেঁচে আছি।
একবার ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বরে অচৈতন্য কবিকে নিয়ে কালিম্পং থেকে মৈত্রেয়ী দেবী ও প্রতিমা দেবী কলকাতা এলেন। প্রতিমাদেবী অসুস্থ থাকায় মৈত্রেয়ী দেবীর হাতে কবির দেখা শোনার ভার ছিল। কবির চিকিৎসার জন্য ডাঃ বিধান রায় এলেন। এসেই মৈত্রেয়ীদেবীকে বললেন, এর বাঁধানো দাঁত খুলে নেননি কেন? জানেন না একজন অচৈতন্য মানুষের শরীরে এসব রাখতে নেই। মৈত্রেয়ীদেবী জানতেন না, তাই লজ্জায় মাথা হেঁট করলেন।
এদিকে কবির জ্ঞান ফিরতেই শারীরিক দুর্ব্বলতা সত্ত্বেও কৌতুক করে জিজ্ঞাসা করলেন আমার কথা কেড়ে নিয়ে গেল কে? রবীন্দ্রনাথকে বাক্যহারা করে কার এত সাহস?
একবার এক দোলপূর্ণিমার দিনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাাৎ ঘটে। তো পরস্পর নমস্কার বিনিময়ের পর হঠাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর জামার পকেট থেকে আবির বের করে রবীন্দ্রনাথকে বেশ রঞ্জিত করে দিলেন। আবির দ্বারা রঞ্জিত রবীন্দ্রনাথ রাগ না করে বরং সহাস্যে বলে উঠলেন, এতদিন জানতাম দ্বিজেনবাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ।
রবীন্দ্রনাথের অভ্যাস ছিল তিনি যখনই কোন উপন্যাস লিখতেন তখন সেটা শান্তিনিকেতনে গুনীজন সমাবেশে পড়ে শোনাতেন। তাঁর সেই আসরে মাঝে মধ্যে যোগদান করতেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। একবার আসরের বাইরে তিনি জুতো খুলে আসার কারনে তাঁর জুতো চুরি হয়ে যায়। অগত্যা পরের বার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জুতো দুটো কাগজে মুড়ে সেটা বগলদাবা করে আসরে ঢুকলেন। কবিগুরু সেটা বুঝতে পেরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করলেন – শরৎ তোমার বগলে ওটা কী পাদুকাপুরাণ? রবিঠাকুরের মুখে এই কথা শুনে সকলেই হাসতে শুরু করলেন।
সভাপতি,
চট্টগ্রাম সাহিত্য পাঠচক্র।
Discussion about this post