বৃটেনে মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন:
একটি খেলায় জাতির দীর্ঘশ্বাস ।
গতকাল বৃটেনের জাতীয় (মধ্যবর্তী) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ দেশেও আমাদের দেশের মত মূলত দু’টি প্রধান দলের মধ্যে প্রতিযোগীতা হয়; লেবার ও কনজারভেটিভ।
নির্বাচনে লেবার কতটা সিট পেয়েছে, কনজারভেটিভ পেয়েছে কতটি তা সকাল আটটা না হওয়া অবধি পরিষ্কার করে বলা অসম্ভব।
কে সরকার গঠন করবে, কি ভাবে করবে তা এখন পর্যন্ত (এখন লন্ডন সময় সকাল তিনটা) পরিষ্কার নয়। কারণ, একক ভাবে সরকার গঠন করার মত সিট কেউ পাচ্ছে না সম্ভবত।
এ দেশের নির্বাচনে কোন জোশ- জজবা নেই। একেবারেই নিরস ও নিরব পরিবেশে বিশ্বের এই পরাশক্তির মরামার্কা ইলেকশন দেখে অবাক হই!
আমি মিছিলে গালাগালি ফালাফালি জ্বালাজ্বালি না করলে মজা পাইনা।
আমাদের দেশের মত এ দেশে মিছিল হয়না, তবে মিটিং হয়। মিটিংয়ের ধরণ চট্টগ্রামের ‘পান-ছল্লা’র মত।
পোস্টার -ফেস্টুন কর্মীদের হাতে থাকলেও কারো দেয়ালে বা এখানে সেখানে লাগানোর বিধান নেই। কারণ, দেয়ালটি তো কোন নেতার ভাবী বা তালতো বোনের নয়।
আমি আমার ইংল্যান্ডের পুরো জীবনে রাস্তা ঘাটে কোন দলের পোস্টার বা ব্যানার দেখিনি। দেখিনি মাইকিং ও মামা ভাগিনার ফাইটিং।
নেতাগণ মিছিল মিটিংয়ের চেয়ে জন সংযোগ করে থাকে বেশী।
নেতাদের জন্য ফুল, মঞ্চ, সামিয়ানা টাঙ্গানোর মত কোন ধরনের অতিরিক্ত তোষামোদি আয়োজন থাকে না। থাকে না দুই একজনের বেশি বক্তা।
বক্তারা তখতা ভেঙে, হাত নেড়ে, অন্য দলকে মুষ্টি প্রদর্শন করে গুষ্টি উদ্ধার করে না। কেউ লম্বা বক্তৃতা দিয়ে মুখ তিতা করে না।
সবাই যার যার নীতিমালা দিয়ে কথা বলেন। ভীতি জ্বালা দিয়ে নয়। দল চলে কলে। ছলে নয়।
নেতারা দেশের উন্নতির পরিকল্পনার উপর যুক্তি নির্ভর কথা বলেন । মানে, একজন নেতা যখন বলবেন “আমি বাস-ট্রেন ফ্রি করে দেব”, তখনই তাকে উত্তর দিতে হবে এই ফান্ড কোথা থেকে আসবে। কে যোগাবে।
বৃটেনে দুইভাবে ভোট দেয়া যায়। সশরীরে পোলিং স্টেশনে গিয়ে অথবা ডাকযোগে। অবশ্য, ডাকযোগে ভোট দিতে চাইলে আগেভাগে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়।
বলাবাহুল্য, আমি রেজিস্ট্রার্ড ভোটার। দেশের মত হৈচৈ না দেখে মনেই ছিল না যে আজ ভোট। আমার স্ত্রী ভোটার হলেও তার সাথে এ ব্যাপারে কোন রকম কথাবার্তা হয় না।
আমি কখনো জানতে চাই নি সে কোন দল করে, সেও বলে নি কোনদিন। কিন্তু আমি কার সাপোর্টার সে জানে।
যাই হোক, সকালে কাজে যাবার আগে ব্যালটে সাইন- ক্রস দিয়ে আমার মেয়েকে নির্বাচন কমিশনের প্রধান অফিসে পাঠালে কমিশন তার হাত থেকে আমার ভোটের খামটি নিতে অস্বীকার করে। তাদের যুক্তি হল, আমার সেলাই করা ভোটের খামটি আরেক জনের হাতে থাকতে পারে না।
রাত দশটার কিছুক্ষণ আগে কাজ থেকে এসে পোলিং স্টেশনে গিয়ে অফিসারের হাতে খামটি মানে ভোটটি দিয়ে আসি। ভোট কেন্দ্র দেখে ভয় পেয়েছি। তিন জন স্টাফ ছাড়া কেউ নেই। সুনসান নীরবতা, পুরোনো চার্চ।
পাঠক ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন, ভোট কেন্দ্রে কোন পুলিশ আনসার নেই। সীমিত সংখ্যক সরকারি স্টাফ। বাকি সব স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী। স্বেচ্ছাসেবী। এখানে গালাগালি নেই, আছে গলাগলি। বিজয়ী প্রার্থীকে কোলাকুলি করে অভিনন্দন জানায় পরাজিত জন। দেখি আর ভাবি আহা কতই না সম্প্রীতি!
এখানে অযোগ্যরা তো বটেই যোগ্যরাও নিজে নিজে সরে পড়েন, কারণে অকারণে।
আমরা দেখেছি, টনি ব্লেয়ার তার তৃতীয় মেয়াদে স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়েছিলেন।
ঐ তো সে দিন ডেভিড ক্যামেরুন তার দ্বিতীয় মেয়াদে শুধু প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়েন নি, সাধারণ সদস্য পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন এক্কেবারে স্বেচ্ছায়।
মন্ত্রীরা ছোট ছোট কারনে পদত্যাগ করেন, তাদেরকে বলতে হয় না।
হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জানতে পারব অমুক বা তমুক দলের প্রধান পরাজয়ের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। এদেশে দলীয় প্রধান বা দল পরাজিত হলে সাথে সাথে নেতা পদত্যাগ করেন। কয়েক মাসের মধ্যে বিশাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, টিভি ও হাজার হাজার মানুষের সামনে নতুন নেতা নির্বাচিত হন।
আমাদেরকে আরো একটু অপেক্ষা করতে হবে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী নাম জানার জন্য।
ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলে জাতির দীর্ঘশ্বাস বেড়ে যাবে বলে মনে হয়।
Discussion about this post