বিশ্ব চরাচরে যত কিছু আছে, আছে যত সৃষ্টি তার সব ক’টিতেই দরজা লাগানো। দরজার ভেতরের কথা দরজা জানে না। রাষ্ট্রীয় কূট চাল এক একটি দানবীয় দরজার মত। দরজা রহস্যের অকূল পাথার। পাথরও এঁকে যায় দরজার ছবি, ঝর্ণা পাথরের চোখের দরজা দিয়ে নামে।
গাছ পেতে হলে বাকল ছাড়াতে হয়, রস বের করতে যেতে হয় একটু ভেতরে। বৃক্ষ তরু লতা সবুজ বনানীর গুণের নির্যাস-দরজাই পৃথিবীর দরদের নিয়ামক। নিয়ামত।
একটি আবিষ্কার অনেকগুলি দরজা খোলার মত।
আবিষ্কারের প্রশাখা বিশাখার অসংখ্য নান্দনিক, শৈল্পিক ও সৌন্দর্যের দরজা রেখে যায় থরে থরে।
একটি কবিতা অনেকগুলি দরজা খুলে বের হয়। প্রতিটি বর্ণে শব্দে ছত্রে রসিকপাঠক অনেক অসম্ভব রকমের কিছু ধ্যান জ্ঞানের দরজা দেখতে পান, তারা তা খুলতে খুলতে জীবনের আসল দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দুর্লোক হারায় দুলোক।
চিন্তার যে অলি গলি তা দরজায় লাগানো পর্দার মত, বাতাসে দুলে, কিছু বেরিয়ে আসে, কিছু থেকে যায়। যা থেকে যায় সে আরেকটি দরজার আবহ রেখে আসে। আমাদের মনে যা একবারে আসে না, তা হয়ত পরে আসে অথবা আরেকজনের হাত ধরে পূর্ণতা পায়।
প্রিয়জন আর প্রেম জানে বিরহের কত অসহনীয় দরজা। সে দরজা আরো বিষাক্ত হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় স্বপ্নিল সে বাগানে ছলনার পোকা মাকড়। প্রতিক্ষার জানালা নরকের জ্বলন্ত দরজা থেকেও বিভীষিকাময়। প্রতিক্ষা অনেক কষ্টের সোপান।
প্রতিক্ষা বড় নির্মম, সে কষ্ট ব্যাখ্যাতীত। কিন্তু আমার প্রস্তাবিত দরজায় কোন কষ্ট নেই, জ্বলন নেই, দলন নেই, ভয় নেই, সন্দেহ নেই, আছে শুধু আনন্দ আর প্রাপ্তি। প্রেম ভালবাসাবাসি।
আমি তোমাকে আরো অনেক অপরূপ সুন্দর , সত্য, শাশ্বত দরজার কথা বলতে পারি। সেই জীবনের দরজা, যৌবনের দরজা, প্রিয়সীর অবগুণ্ঠনের সে প্রথম ঝলক পলকের দরজার কথাও। তারও গভীরে আরো কত দরজা! দরজা অতিক্রম করেও শেষ হয় না সে দরজার আয়েশ আবেশ! এখানে আমি আরো এক কঠিন অথচ সুখদ দরজার কথা বলতে পারি যার উপকরণ শামিমে সামিয়ানায়।
ফুল অনেক দরজা খুলে খুলে প্রস্ফুটিত হয়, কসমসে, অরবিটে, সে রহস্যময় আকাশে অনেকগুলি দরজা আছে। সে দরজার চাবি মানুষের আছে। যে বুঝে সে বুঝে চাবির মন।
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহও ঐ আকাশে অবস্থান করে। নবী (স) যখন মিরাজে গমন করেন তখন তাঁকে অনেকগুলি দরজা অতিক্রম করে করে আল্লাহ পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। আল্লাহ যেখানে আছেন সে দরজা পর্যন্ত গিয়ে নবীজী যাত্রা থামিয়ে দিয়েছিলেন। সে দরজা তিনি খুলতে চান নি, জান্নাতে দরজা বিহীন আল্লাহকে দেখবেন বলে।
সে দিন দরজার ভেতরে তিনি অনেক আলো, অনেক অনাবিল রূপ রহস্য দেখতে পাবেন- সে এক অপার রহস্য, অনন্ত অগণিত প্রতিশ্রুত করুণার একটি দরজা দেখে দেখে জান্নাতিগণ সম্মোহিত হয়ে পড়বেন! সেখানে নাজ নিয়ামত, নহরের শহরে তামাম সৃষ্টির সে প্রেম, সে প্রেমিক তাঁর সব প্রেম নিয়ে উদ্ভাসিত হবেন, নিবেদিত হবেন।
আমি প্রেমালয়ে সে সোনালি জানালার পাশের দরজার কথা নিবেদন করছি।
সৃষ্টিতত্ত্ব দরজার ক্রম বিকাশ এবং বিভাজন।
শুক্রচক্র থেকে শুরু করে কবর হয়ে বরজখের স্তরে স্তরে দরজার বিস্তার। সে দরজা বড় কঠিন কিন্তু “উলিল আল বাব” এর জন্য কঠিন নয়।
একজন মানুষের শেষ প্রত্যাশা সেই দরজা। একজন পূণ্যবানের পূর্ণ ঠিকানা সেই দরজা। এখানে অলৌকিক আধ্যাত্মিক মন মননের সব চাবি সহজ লভ্য হয়, যা দিয়ে সে খুলতে পারে জীবনের সব চাহিদার দরজা।
আমি একজন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে সে সোনালি স্বপ্নিল স্বর্গীয় একমাত্র দরজার কথা বলছি। যে দরজার পর আর কোন দরজা নেই, যে দরজার পর আর কোন দরজা দরকার নেই। আর যা হবে তার সবই মায়া, মরীচিকা, মিথ্যা, প্রতারণা, ধূপ, ধূল, খেলাঘর এবং কাগজের ফুল। ভুল।
একজন বিজ্ঞজনের জন্য আল্লাহর আহ্বান: “ইয়া উলিল আলবাব”- হে সমঝদার,,,,,। মূলত
আরবি ‘বাব’ অর্থ দরজা। আলবাব অর্থ সমঝদার।
এখানে আল্লাহ যাদের জ্ঞান বিজ্ঞান দান করেছেন তাদেরকে তিনি “উলিল আলবাব” বলে সম্বোধন করেছেন। শব্দটি কুরআনে ষোল বার আছে। মানুষের জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ষোলটি দরজা (জীবনচক্র) পার হতে হয় বলে উলিল আলবাব ষোল বার এসেছে সম্ভবত।
‘বাব’ মানে দরজা। জ্ঞান সম্পদ ও আমানত। আমরা ব্যাংকে টাকা জমা দিলে কর্তৃপক্ষ আমাদের আমানতের খেয়ানত করতে পারে না, আমার চাইলেই হিসেব নিতে পারি, ব্যাংক হিসেব দিতে বাধ্য, আমাদের জীবন, যৌবন, অর্থ ও জ্ঞানও সে রকম। স্রষ্টা এর হিসেব চাইবেন, সে দিন দুটি দরজা খোলা রাখা হবে- জান্নাত বা জাহান্নাম। এ বোধশক্তি মানুষের আছে বলে তারা উলিল আলবাব। মানুষ স্রষ্টার প্রতিনিধি এবং মারেফাতের ঋণি।
খণি খনন করতে হয়, খুলতে হয় দরজা। এ জন্য বোধ, বিশ্বাস এবং স্রষ্টামুখিতার নাম দরজা।
বিজ্ঞানের সব শাখা এক একটি অজানা দরজা খোলার জন্য তেপান্তরি হয়। অথচ সব দরজার সম্মিলন এক দরজায়।
হে আশরাফুল মাখলুকাত! আমি তোমাকে সে পূর্ণাঙ্গ দরজার কথা বলছি।
লন্ডনে এখন ভোর রাত, কিছুক্ষণ পর পৃথিবীর সব কালোর দরজা ভেঙ্গে ভেঙ্গে আলোর স্বর্গীয় দরজা রচিত হবে। পাখিরা গাইবে সুখের গান।
আমি লিখছি দূর থেকে পাওয়া পরম প্রিয়ের কথা।
দু’হাত বাড়িয়ে ডাকি জীবনের সেরা এবং শেষ দরজায়। এক সাথে র’বে যে পরম সত্ত্বায়।
Discussion about this post