বিয়াদবী মাফ করবেন
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী
**
(লেখাটি এগার বছর আগের। আজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছি। এর আবেদন আগের মত নাও থাকতে পারে। তখন এ লেখাটি আর পড়তে হবে না);
লেখাটি উৎসর্গ করা হল আজাদীর খোরশেদ আলম ভাই
এবং সোহেল মো: ফখর-উদ্দিনকে। খোরশেদ ভাই নিজ হাতে টাইপ করে এটি প্রকাশ করেছিলেন আর সোহেল ভাই সব জানতেন, তাঁকে বলে বলে আমি এ সব সংগ্রহ করতাম, লিখতাম। কোনখানে গেলে সোহেল ভাই আমাকে বলতেন ভুল বানান বের করার জন্য, পেয়েও যেতাম)।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। স্রষ্টা প্রদত্ত স্বর্গ থেকে পাওয়া ভাষা। যে ভাষার জন্য এত রক্তপাত, যে ভাষায় এনেছে স্বাধীনতা, দেশ এবং পতাকা, সে দেশেই বাংলাভাষা যেন অচল, অবহেলিত। এখন কারো বাসায় আর বাংলা টিভি চলে না। বাংলাদেশে বাংলা নেই অবস্থা! পথে পথে ভুল, ভুল সর্বত্র। বুঝি না ‘এসো না’ এবং ‘এসোনা’ শব্দের পার্থক্য। খাই নি, চাই নি, যাই নি সব সময় দুই শব্দ। এখন আমরা এক করে নিয়েছি। লিখি ‘খাইনি’। এরকম দুই শব্দ কখন এক হবে, কখন দুই শব্দে লিখতে হবে তার একটি এলাকা আছে।
সাধু- –চলিত ভাষার বাছ-বিচার বর্তমানে অনেকের কাছে নেই বল্লেই চলে। এই ভুল বড় বড় লেখকেরাও করেন। আমরা মাইন্ড কনি না। কারণ, তিনি বড় (?) লেখক।
আমার এক অধ্যাপক বন্ধু বলল সে একই প্রবন্ধে সাধু চলিত মিলিয়ে লিখতে পছন্দ করে!
আমরা এমনও আছি ভুল লিখে মোবাইল বা কম্পিউটারের দোষ দিয়ে মুক্তি চাই। অনেকেই ভুল বানানকে স্বীকার না করে আজগুবি কথাবার্তা দিয়ে ভুলকে ফুলের মত বুকে নেয়; এসব ভাল মানসিকতার পরিচায়ক নয়।
দুই হাজার এগার সালের ঘটনা।
আমি দেশে গিয়েছিলাম। পথে চলতে চলতে কিছু ভুল বানান সংগ্রহ করেছিলাম। এর উপর চট্টগ্রামের আজাদীতে একটি কলাম লিখেছিলাম। পরবর্তীতে লেখাটি অস্ট্রেলিয়ার একটি সাপ্তাহিকেও ছাপা হয়।
পাথর ঘাটার সেবক কলোনীর পাশের রাস্তায় একটি পোষ্টার আমার নজর কাড়ে। হিন্দু ভাইদের একজন পরম পুরুষের স্মরণ সভা হবে। কিন্তু বানানটি করেছেন ‘স্বরন’ করে।
নজরুল স্কোয়ার্ড (ডিসি হীলে) জেলা প্রশাসক আমাদের পকেটের টাকায় একটি শুভেচ্ছা বাণী লিখেছেন।—‘নব বর্ষ উপলক্ষে চট্টগ্রাম বাসীকে শুভেচ্ছা’। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কোন ধরণের শুভেচ্ছা? ‘বাসী’ শব্দটি আলাদা হওয়াতে এর অর্থ হবে পুরাতন, পচাঁ-গলা, বা যা তাজা নয়। কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য যদি ‘বাসী’ সম্ভাষণ হয়, তিনি যদি চট্টগ্রামবাসীকে ‘বাসী’ মনে করেন তা হলে আমার কিছু বলার অধিকার থাকার কথা নয়।
গত ১১ মে শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে চট্টগ্রাম ইতিহাস গবেষক সম্মিলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। তার পরের দিন একই সংগঠনের পক্ষে বক্তব্য রাখার জন্য মাওলানা ইসলামাবাদী উচ্চ বিদ্যালয়ে যাই। আমি অন্যান্যদের জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছিলাম। খুটিয়ে খুটিয়ে ব্যানার, দেয়াল লিখন ও পোস্টার পড়া আমার অভ্যাস। সেখানে প্রধান শিক্ষকের অফিসের সামনে দেখলাম মাওলানা সাহেবের গ্লাস ভাঙ্গা প্রতিকৃতি। একটু নিচে তাঁরই রচিত ছয় লাইনের একটি ছান্দিক কবিতা। কিন্তু পড়তে গিয়ে আমি পড়তে পারছিলাম না। কারণ, কর্তৃপক্ষ নিচের দিক থেকে শেষের পঞ্চম লাইনে মিল যথাযথ রাখেন নি। কবিতাটি যেহেতু সমিল, সেহেতু শব্দের ও লাইনের সঠিক ব্যবহার যুক্তিযুক্ত ছিল। যাঁর নামে এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে দুই হাত জায়গা ছেড়ে দেন নি কর্তৃপক্ষ। আর আরবী বানানরীতি অনুযায়ী ‘মৌলানা’, ‘মওলানা’ না হয়ে ‘মাওলানা’ হওয়াটাই সঙ্গত বলে আরবী গ্রামার মনে করে। কারণ, মিমের উপর ফাতাহ বা জবর আছে।
আমরা সারা জীবন ‘রবীন্দ্রনাথ’ এক শব্দ পড়েছি। স্কুলের ২য় তলার শ্রেণী কক্ষের দরজায় দেখলাম ‘রবীন্দ্র নাথ’, দুই শব্দ। সক্রেটিসের একটি বাণীতে ‘গুণ’ শব্দটি হয়েছে ‘গুন’। ভাগ্যিস ‘ঘুণ’ হয়ে যায় নি।
তার পাশে কে বি আবদুছ ছাত্তার সড়ক। পাথরে খোদাই করে লেখা হয়েছে কেবিআবদুছছাত্তারসড়ক- এক শব্দে।
‘চট্টগ্রাম’কে ‘চট্রগ্রাম’ করে লিখছেন অনেক নামি দামি মানুষ ও তাদের সংগঠন।
‘আমি যাই সে যায়’। কখন ই হবে, কখন য় হবে এর ফয়সালা হচ্ছে না অনেকের।
ও টি টা খানা খানি পড়েছি তৃতীয় শ্রেণীতে । এখন বিশ্ববিদ্যালয়েও সে সিলেবাস নেই।
চট্টগ্রাম কলেজের সামনের রোড, ‘কলেজ রোড’।
সরকারের কাছে অনেক লেখালেখির পর ড. ‘এনামুল হক সড়ক’ হয়েছে। কিন্তু সেখানে পরিবর্তিত নামের পাশে ‘কলেজ রোড ‘ নামেও ফলক আছে। কোন কোণায় ‘ড. এনামুল হক সড়ক’ কথাটি লেখা হলেও তার পাশের ময়লার স্তুপের কারণে ফলকটি খুবই অপমানিত হচ্ছিল যেন। এর উপর দৈনিক আজাদীতে আমি একটি চিঠি লিখেছিলাম, শিরোনাম ছিল ‘কী নামে ডাকব তোমারে ‘ ? চট্টগ্রামের মানুষ এখনও ড. এনামুল হক সড়ক চিনে না। সিটি কর্পোরেশন নামটি প্রচারের জন্য কোন রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না । কারণ, এখনও প্রতিটি দোকানের সাইনবোর্ডে ‘কলেজ রোড’ লেখা আছে।
বলছিলাম মাওলানা ইসলামাবাদী স্কুলের কথা।
আমরা জানি
‘যথাক্রম’ এক শব্দ হওয়া নিয়ম। লেখা হয়েছে দুই শব্দে ‘যথা ক্রম’ রূপে। ‘স্কুল পরিচালনা পর্ষদ’এর একটি তালিকা চোখে পড়ার মত। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়েছে, কর্তৃপক্ষ কারা কারা স্কুল চালান তার একটি তালিকা জনগণকে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু একটি ‘দাঁড়ি’র কারণে তাঁদের সে মহৎ প্রত্যাশা সফল হয় নি । ‘স্কুল পরিচালনা পর্ষদ’ লিখে কর্তৃপক্ষ ‘দাঁড়ি’ বসিয়েছেন। শিরোনামে দাাঁড়ি। যার কারণে, বর্ণিত ব্যক্তিবর্গ কে তা আর পরিস্কার হয় নি। ধরে নিলাম, পরিষদের সভাপতি আ জ ম নাছির ভাই। কিন্তু আ-তে কমা, জ-তে কমা, ম-তে কমা কেন হবে তা আমার ঘিলুতে আসে না। প্রশ্নটি তাঁরাই প্রকট করেছেন। কারণ, মোমিন রোর্ডের মেইন গেইটের সাইনবোর্ডে কর্তৃপক্ষ আ-তে ফুল ষ্টপ, জ- তে ফুলষ্টপ, ম-তে ফুলষ্টপ বসিয়েছেন। তা হলে শুদ্ধ বানান কোনটি? উত্তরটি একমাত্র নাছির ভাই-ই দিতে পারবেন। কারণ, নামটি তাঁর পিতা প্রদত্ত সম্পদ। এ ছাড়াও আরো অনেক ভুল বানান বা ভুল সাংকেতিক চিহ্নের প্রয়োগ চোখে পড়ার মত। যা একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলের দেয়ালে মানায় না। তদুপরি, এলাকাটি ‘সংবাদপত্র পাড়া’ নামেও পরিচিত।
বর্তমান আধুনিক যুগের উচ্চ শিক্ষিত লেখকদের বানান রীতি, শব্দের গঠন নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য চিন্তা করছি। সেখান থেকে ভাল কিছু কথা বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রথমত আমাদের শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। আমরা ভুল করে উল্টো রাগ করতে পারি না। সব সময় আপনি বেশি বুঝেন, আর কেউ বুঝে না – এমন মাতব্বরি মনোভাব সাহিত্যের জন্য, সমাজের জন্য এবং ধর্মের জন্য অপরাধের কারণ।
আমরা ইউরোপে বসে অনেক কষ্ট করে বাংলা চর্চা করি। পরিবেশটি আমাদের অনুকুলে নয়। তারপরও আমরা লিখি শিখি।
বাংলাভাষার ঐশ্বর্য, শব্দের লালিত্য, ছন্দের মোহময় দ্যোতনা নিয়ে আমি ইউরোপের পত্রিকায় বহুবার লিখেছি, সেমিনার করেছি। বাংলাদেশের বাংলাই তো আমার আদর্শ এবং ঠিকানা । প্লিজ, আমাকে হতাশ করবেন না।
জানি, ইউরোপ থেকে এসে এ সব কথা বলা মানে বিয়াদবী করা। আর আমি বাংলাসাহিত্যেরও ছাত্র নই। এত কথা বলার যোগ্যতা রাখি না। তাই নিজ গুণে মাফ করবেন বলে আশা করি।
বিনীত,
নজরুল ইসলাম হাবিবী
2011
Discussion about this post