মরুভূমির ধু-ধু শব্দে গর্বের বার্তা
মোফাচ্ছেল হক শাহেদ ০২/০১/২০১৯(ইউ.এ.ই)
___________________________________
#বালু_পাথর ও #পাহাড় নিয়ে পৃথিবীর পাঁচ ভাগের একভাগ জায়গা জুড়ে মরুভূমি। আমি এখন বালুকাময় মরুভূমির একটা উঁচু অংশে দাঁড়িয়ে স্ট্যাটাস লিখছি।বলাবাহুল্য আমি কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য আরব আমিরাত প্রবাসী।এককথায় রেমিট্যান্স যোদ্ধা।বেঁচে থাকতে হলে কর্ম করা ছাড়া গতি নেই,কর্মের মধ্যেও বিভিন্ন দিক রয়েছে।সৎ কর্মকেই গ্রহণ করেছি।সৎ কর্মের পারিশ্রমিক অনেকটা কম হয়,তারপরও অল্পতেই তুষ্ট আছি।আমার এবং পরিবারের ভরণপোষণ হচ্ছে।এখানে আমার পরিচয় মা-বাবার ও দেশের একজন গর্বিত সন্তান।তাই লজ্জা শরম ভুলে বলতে হয় আমি কোনো পিকনিকে আসি নি,আসছি বস এর পরিবার নিয়ে আবু ধাবী’র একটি মরুময় সাইটে।এখানে তাজা ওজনের উটের মেলা।বস এর ছেলেমেয়েরা উটের পিছু পিছু ছুটে হৈ হুল্লোড়ে করছে খেলা।ওদের মজা করা আর আমার ডিউটি করা।গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলে ওরা ওদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে।আমিও একাকী সোনালী বিকেলে রৌদ্রতপ্ত বালুতে হাঁটছি এবং আপনজনদের কথা ভাবছি।বালু’র ধু-ধু শব্দ অনেক কিছুই কানে বাজছে, অনেক স্মৃতিই চোখে ভাসছে।পায়ের তলায় বালু,যেদিকে চোখ যায় শুধুই বালুর স্তূপ। দেখে খুব হিংসা হচ্ছে,২০১৪ সালে দেশে যখন বাড়ি বানাতে গেলাম,এই বালু নিয়ে কতইনা কষ্ট সহ্য করেছি;তবে ধৈর্য হারা হয়নি।অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কারণে বালু পাওয়া যাচ্ছিল না,পরে এলাকার মুরুব্বীদের সহযোগীতায় ডাবল দামে বালু কিনতে হয়েছিল।তাও বালুর নাম্বার নিয়ে সংশয় ছিল,জানতাম না যে বালুরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে,আজ জানলাম ও জানিয়ে রাখলাম। যেমনঃ-
#এক,ভিটি বালু(ফিলিং এর জন্য)।
#দুই,লোকাল বালু(কংক্রিট ঢালাই এর জন্য)।
#তিন,সিলেট বালু বা লাল বালু(কংক্রিট ঢালাই এর জন্য)।
#চার,চিকন বালু বা প্লাস্টার বালু(দেয়াল প্লাস্টার এর জন্য)।
এখানে নিম্নমানের বালু হচ্ছে ‘ভিটি বালু’ যা ময়লা যুক্ত।এটা কিনে আমি অনেকবার ঠকেছি সুতরাং আপনি কেন ঠকবেন? দেখে বুঝে বালু কিনুন,না হয় সাদাসিধে ক্রেতা হয়ে আমার মতন ঠকুন।ব্যবসায়ীরা উকুন আবার শকুনও,খিদে সব সময় ওদের। রক্ত মাংস খেয়ে পেট ভরাট,তবুও ঢুঁ মারার অভ্যাস। আরেকটা কথা জানুন,বালু দিয়ে কাঁচ তৈরি হয়।এই কাঁচ মূলত তিনটি উপাদান দিয়ে তৈরি ১)#বালি ২)#সিলিকা ৩) #সোডা। যখন এগুলির মিশ্রণকে ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে উত্তপ্ত করা হয়,তখন গলতে শুরু করে এবং তৎক্ষণাৎ ঠাণ্ডা করলে কাঁচ হয়ে যায়।এই কাঁচ দিয়ে কাঁচের চুড়িও বানানো হয়।মহিলাদের সুন্দর হাতের জন্য সুন্দর কাঁচের চুড়ি আকর্ষনীয় বটে। ভারতের ছোটখাট এক শহর ফিরোজাবাদ। নয়াদিল্লী রাজধানী থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরটি কাঁচ শিল্পের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। বিশ্বে কাঁচ শিল্পে সবচেয়ে এগিয়ে বেলজিয়াম।কাঁচের সব ধরনের জিনিসপাতি বানাতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করেন তারা;তবে ভারতের ফিরোজাবাদে কাঁচ তৈরি করে সেই পূর্বেকার পদ্ধতিতে।জেনে রাখা ভাল চীনের গুয়েলিন এ কাঁচের তৈরী সাঁকো রয়েছে একটি।যাইহোক আবারও ফিরে আসি সেই মরুভূমির বালু প্রসঙ্গে;আফসোস হয় দেশের ঐসব বালু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড দেখে। এক নাম্বার বলে তিন নাম্বার ঢুকিয়ে দেওয়া খুব লক্ষণীয়। আর এখানে আরব আমিরাতে বালুর সমুদ্র।জাহাজ স্বরূপ উট গুলো মরু সমুদ্রে স্বাভাবিক চলাচল করছে।সেই বালুর ওপরেই মলমূত্র ত্যাগ করছে।আমিও ব্যতিক্রম নয়,আজ প্রকৃতির সাথে মিশে গেছি।থাকুক সেই কথা।এই মরুভূমিতে এসেও আমার প্রাণের ভাষা বাংলা ভাষায় কথা বলার যে দু’জন লোক খুঁজে পেয়েছি,সেটাই বড় প্রাপ্তী। একজন রাঙ্গুনীয়া’র মুহাম্মদ আবদুর রশীদ ভাই অন্যজন পটিয়া’র মুহাম্মদ আলী ভাই।আমি তো রাউজানেরই ছেলে।তিনজনের চট্টগ্রাম বিভাগ হওয়াতে আঞ্চলিক কথাবার্তায়ও ৯৯%মিলে যায়।আমি তাদের জন্য ‘গর্বা’ স্বরূপ। গর্বা আঞ্চলিক চট্টগ্রামের ভাষা,গর্বা মানে গেস্ট/অতিথি/মেহমান।আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষা।বাংলা ভাষার জন্য ১৯৫২তে আত্মদানে #রফিক,#সালাম,#বরকত ও #আব্দুল_জব্বার এবং আরও আরও ভাইয়ের রক্তের কালি অমর অফুরন্ত হয়ে সবার মুখে বুকে জমা রয়েছে।সেই থেকে তাদের স্মরণে শহিদ মিনার এবং সেই শহিদদের সম্মানে পুষ্প মাল্য প্রদান করে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি…আমি কি ভুলিতে পারি” সুরে সুরে স্মরণ করি। সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে গানটি রচনা করেন। প্রথমে আবদুল লতিফ গানটি সুরারোপ করেন। তবে পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদের করা সুরটিই অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে, ১৯৫৪ সালে প্রথম গাওয়া হয় আলতাফ মাহমুদের সুরে গানটি এবং এটিই এখন প্রাতিষ্ঠানিক সুর।আরও জানা যায় ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়।এতে গর্বে আমার মন আকাশছোঁয়া।
আরও গর্ব হয় ১৯৯৯ সালে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে।আরেকটি জায়গায় গর্বে হৃদয় আমার টইটুম্বুর আর সেটা হচ্ছে “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি”ভাষাসৈনিক #মাহবুব_উল_আলম_চৌধুরী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটি ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখিত প্রথম কবিতা। এই জন্য কবিতাটিকে একুশের প্রথম কবিতাও বলা হয়। আমার গর্বের কারণ হচ্ছে তিঁনি কবি ‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী’ আমার রাউজানের বাসিন্দা।এবার আসল কথায় আসি,জানপ্রাণ বিসর্জন দিয়ে যে বাংলা ভাষা অর্জন করেছে ভাষাসৈনিকরা;সেই ভাষা কি করে অবেলায় অবহেলায় অন্যন্যা ভাষায় রুপান্তরিত হয়ে নিমজ্জিত হবে?কখনও হতে দিয়া যাবে না।সেই লক্ষ্যে বেঁচে থাকা ভাষাসৈনিকগণ তাদের সাধ্যমত শক্তি সাহস যোগিয়ে নতুন প্রজম্ম থেকে বাংলা ভাষাকে ঠিকিয়ে রাখার মানসে মানানসই লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।প্রতি বছর ‘বই মেলার’ আয়োজন হয়।এতে করে বাংলা ভাষার শ্রী বৃদ্ধি ও শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছে।যুগপোযোগী তরুণ লেখকদের নতুনত্ব শব্দ অভিধানে যুক্ত হচ্ছে।আরও অনেকেই অনলাইন ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক/ফেসবুক পেইজের দ্বারা সাংগঠনিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বাংলা ভাষার প্রচার প্রসারে ভুমিকা রেখে যাচ্ছেন বিশ্ব দরবারে।সেইরকম একজন বহুদর্শী পছন্দের মানুষ আছেন, যার কথা উল্লেখ না করলেই এই লিখাটি নিরর্থক মনে করি;ইতিমধ্যে সবায় তাঁর বিষয়ে অবগত আছেন।আজকে ২রা জানুয়ারী তাঁর শুভ জম্মদিন।অনেকেই হয়তো সামনাসামনি শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন আবার কেউ কেউ ফেসবুকে।আমি এরমধ্যে নেই, কারণ তিঁনার একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম,যেখানে লিখা আছে “জম্ম মৃত্যু একটি মুদ্রার এ পিট ও পিট মাত্র। জম্মদিন পালন করা মানে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়া”।এখানে কাঁদা উচিৎ।এরপরেও অল্পতে কিছু বলতে হয় তিঁনি একজন লন্ডন প্রবাসী এবং বাংলাদেশ ও ইউকে থেকে রেজিস্টার্ড চ্যারিটিবল অর্গনাইজেশন ‘সারাহ-হাবিব ট্রাস্ট লন্ডন’ ( দুই দুনিয়ার সংগঠন ) এর অঙ্গ সংস্থা, “অক্ষরে অমরতা” শ্লোগানের পতাকাবাহী আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সমাজকল্যাণমূলক সংগঠন ‘কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন’এর সম্মানিত পরিচালক #অধ্যাপক_নজরুল_ইসলাম_হাবিবী স্যার।
যিঁনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক।গজল,গান,ছড়া,কবিতা,ডিকশনারী, শিশু সাহিত্য এবং প্রবন্ধ মিলে এ যাবৎ তিনি ১৮টি বই প্রকাশ করেছেন এবং আরও প্রকাশিত হওয়ার পথে।বের করেছেন সুর কাওসার নামে গজলের এ্যালবাম। তাঁর লেখা চারটি বই বাংলাদেশ এবং লন্ডনের স্কুল এবং কিন্ডার গার্টেনে সিলেবাসভূক্ত হয়েছে। তিনি নন মুসলিমদের জন্য কমিউনিটিতে ফ্রি আরবী ও বাংলা ক্লাস চালু সহ দেশে-বিদেশে ফ্রি কোরআন ও ইসলামিক বই বিতরণ করে থাকেন।আমি নিজেকে ধন্য মনে করি উক্ত সংগঠনের ২০১৮ তে নবগঠিত কমিটিতে আরব আমিরাত চ্যাপ্টার এর সাধারণ সম্পাদক হতে পেরে।এখানেও আমার গর্বের শেষ নেই। কেননা হাবিবী স্যারের বাড়িও আমার রাউজানে।কিন্তু দু’জন দুই দেশে হওয়াতে সরাসরি কখনো দেখা হয়নি,সামনে কোন এক সময় দেখা হবে এই আশায় বুক বাঁধি।ওনার লেখালেখি পড়ে আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাবোধ এমনিতেই জাগ্রত হয়।
তিঁনি অনেক পরিশ্রমী,সময়ের মূল্য বুঝেন।একজন অধ্যাপক হওয়া স্বত্বেও নিয়মিত শিখছেন এবং শেখাচ্ছেন।এখানেও আমার গর্বের বিষয়,যিঁনি শিক্ষক তিঁনিই ছাত্র।এমন ওস্তাদ হাতে গোনা আছে ক’জন মাত্র?আল্লাহ্ পাক তিঁনাকে অহংকার মুক্ত রাখুক।স্যারকে অধিক পছন্দ করি এবং ভালোবাসি,আজকে তাঁর জম্মদিন উপলক্ষে তাঁর আর আমাদের পছন্দের সংগঠন “কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন”নামটি মরুভূমির বুকে স্বহস্তে লিপিবদ্ধ করে উক্ত সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করলাম।এটি একটি ইতিহাস হয়ে থাকবে আশা করি।ইতিহাস কথা বলে,বাংলাভাষা অর্জনে আত্মবিসর্জনে মাতৃভাষা।সুতরাং এই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের সাহিত্য সমাজের পাশাপাশি সমগ্র বাঙালি জাতির দায়িত্ববোধ থাকা উচিৎ।লেখকদের আর পাঠকদের ভুমিকা অপরিসীম।সদিচ্ছা নিয়ে সবাইকে ভাষাসৈনিকের কাতারে আগে-পিছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে আর রেলগাড়ির বগির ন্যায় লাগালাগি এগিয়ে চলতে হবে।তাহলেই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা পাবে বলে মনে করি।
পরিশেষে বলি,
‘অমর একুশ’ দিয়েছে মুখের বুলি!
গুলিতে শহিদ ভুলিতে কি পারি?
এখনো শুনি রক্তের বুদ্বুদ আহাজারি!
সে রক্তের কালিতে লিখা-
একেকটি বর্ণের অগ্নিশিখা;
বাংলা ভাষার প্রদীপ জ্বালিয়ে-
বিশ্বকে করবো বিস্ময়,
এটাই’তো সময়।।
________________________
Discussion about this post