(জন্ম ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৫০সাল)
জিয়া হাবীব আহসান, এডভোকেট,
চট্টগ্রামে আঞ্চলিকতা টিকে থাকার পেছনে প্রধান যা লক্ষণীয়, তা হলো এখানকার চাটগাঁইয়া ভাষা। চাটগাঁইয়া বা চিটাইঙ্গা ভাষা হলো ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে একটি। ইন্দো-আর্য ভাষাগুলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগুলোর একটি শাখা। বাংলা ভাষার সঙ্গে চাটগাঁইয়া ভাষার একটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ থাকা সত্বওে একে বাংলা প্রমিত ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও ভাষাদ্বয়ের শাব্দিক ব্যবহারে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান রয়েছে। কোনো কোনো ভাষাবিদ একে পালি ভাষার সংকর বলতে চান। চট্টগ্রামের ভাষায় প্রচুর অ্যারাবিয়ান, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষার শব্দ রয়েছে, কারণ তৎকালীন বণিকেরা সওদাপাতির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরেই প্রথম আসতেন। জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ (অন্য জরিপ অনুযায়ী ১ কোটি ৭০ লাখ) মানুষ চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে।
২০২০ সালে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টে প্রকাশিত বিশ্বের ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় স্থান পায় চাটগাঁইয়া ভাষা। যেটি ১ কোটি ৩০ লাখ কথ্য ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে পৃথিবীর ৮৮তম বৃহত্তম ভাষা ও বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার দিক দিয়ে প্রথম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।আধ্যাত্মিক সাধক হযরত বদর শাহ্ আওলিয়ার আবাদ ভূমি,পাহাড়,সমুদ্র অরণ্যঘেরা নদী বিধৌত প্রকৃতির অপরূপ শোভায় শোভিত স্বর্ণ প্রসবনী চট্টলার বুকে যুগে যুগে যে সমস্ত মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করে চট্টগ্রামকে ধন্য, আলোকিত ও গর্বিত করেছেন, যারা জীবন মন্থন বিষ নিজে পান করে উথিত অমৃত দেশ ও জাতির কল্যাণে দেশ ও জাতিকে দান করে যাচ্ছেন, যারা সদা সত্য ন্যায় ও সুন্দর প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত এবং সর্বোপরি যাঁরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদি রচনা করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে ধরে রাখতে মরণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী অন্যতম।চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তিনি সাহিত্যিক ছড়া, কবিতা, পুঁথি দিস্তান, গান রচনা করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে সবসময় প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ৩১শে ডিসেম্বর ফটিকছড়ি থানার দৌলতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ্ব বাদশা মিঞা চৌধুরী, মা মরহুমা জাহানারা বেগম। মাত্র চার বছর বয়সে এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর দু’টি পা অচল হয়ে যায়। এর ১ বছর পর তিনি মাতৃহারা হন। ফলে বড় ভাই আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন চৌধুরীর পরম স্নেহের পরশে তিনি চলার পথ খুঁজে পান। মেধাবী এ লেখক প্রতিবন্ধী হয়েও সৃজনশীল চিন্তাধারায় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। দৌলতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু এবং প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় মেধাবৃত্তি পেয়ে নিজের প্রতিভার সাক্ষর রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে কাটিরহাট উচ্চ বিদ্যালয় হতে অংকে লেটারসহ (মানবিক শাখা) প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৭৪ সালে ডিগ্রী পাশ করেন। পরবর্তীতে আইন কলেজে পঙাশুনা করা অবস্থায় আর্থিক অস্বছলতার কারণে বেশীদূর এগিয়ে যেতে না পারলেও সাহসী মনোবল নিয়ে তিনি তার সাহিত্য সাধনাকে এ অবধি চমৎকারভাবে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। তার সহধর্মিনী রুবী আকতারও একজন গুণান্বিতা শতভাগ আদর্শ রমনী। তাঁদের তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান নিয়ে ভালবাসার ফুলঝুড়িতে তারা সুখী দম্পতি।চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি রচনা করেছেন বহু কবিতা ও ছড়া। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কতি ও ঐতিহ্য নিয়ে জীবনবাস্তবতায় যে কজন সাহিত্যিক সফল হয়েছেন লেখক আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী তাদেরই একজন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ছড়া, কবিতা, গান, পুঁিথ, গীতিমালা, দিস্তান প্রভৃতি রচনা করে তিনি এ ভাষাকে সমগ্রদৃষ্টি ও সমৃদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। তার ১৭ টি কবিতা বই রচয়িতা ,৯টি প্রকাশিত ,বাকী গুলো প্রকাশিতব্য।মহান মুক্তিযুদ্ধের এ গোয়েন্দা সৈনিক পংগুত্বের অভিশাপকে জয় করে প্রতিবন্ধীদের জন্য গ—ে তুলেন ব্রাইট ডিজএবল ফাউন্ডেশন নামক প্রতিস্ঠান ,পেশায় তিনি একজন শিক্ষকও ।চলন প্রতিবন্ধী অসাধরন এ কবি প্রতিভার স্বীকৃতি আজো মিলেনি ।হুইল চেয়ারকে সাথী করে ৫ম সন্তান কে নিয়ে আমাদের কোর্ট চেম্বারে এসেছিলেন তিনি মানবতার কাজে ।আমাদের অনুরোধে স্বরচিত একটি আধ্যাত্বিক গান নিজ সুরে গেয়ে শুনালেন ।আন্চলিক ছড়া শিল্পী হিসেবে তার সুনাম সর্বত্র । তার জীবনোপলব্ধি নতুন প্রজন্মকে শিকড় সন্ধানের পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকবে। আবহমান চট্টগ্রামের সাথে কবি আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী’র সম্পর্ক মানসিক ও আত্মিক। এতদাঞ্চলের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যমন্ডলী তিনি অবলোকন করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। আর তাই তার রচনায় বারবার সে কথাই বেজে উঠেছে। উনার প্রকাশিত সকল বইতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বিলুপ্তপ্রায় শব্দ, নাম, দ্রব্য ইত্যাদি ইতিহাসের পাতায় ধারণ করার আকুলতা পরীলক্ষিত হয়েছে। এইসব সংকলনে লেখক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রতি শুধু ভালোবাসার বহি:প্রকাশই ঘটাননি, পাঠকদের সচেতন ও উপলোব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। জীবন সায়াহ্নে আঞ্চলিক মাতৃভাষায় সাহিত্য সাধনা করে তৃপ্তবোধ করেছেন এ লেখক। যা অন্য ভাষায় সম্ভব হতো না। যার উদাহরণ টেনেছেন মধূসুধন দত্তের সাথে তুলনা করে। লেখক বাংলা বর্ণের সাথে মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে চাটগাঁইয়া দিস্তান উপস্থাপন করেছেন, যা অত্যন্ত আকর্ষনীয়। পুঁথি ও ছড়াসমূহ আমাদের সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্যকে স্মরন করিয়ে দেয়। শারীরিক চলন প্রতিবন্ধী হলেও লেখক আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার ও আদর্শ শিক্ষক। অসম সাহসী এ জীবনযোদ্ধা হুইল চেয়ারে চলাচল করলেও সমাজসেবা ও প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে গোয়েন্দা হিসেবে মুক্তি সংগ্রামীদের জন্য তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক অবদান রাখেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ব্যাথার পারাবার, ছঙায় ছন্দে জীবন স্মৃতি উপহার, এক বৈউমত দুই ডইলা আচার, এক বৈউমত তিন ডইলা আচার এবং অশ্রুমালা।দীর্ঘ প্রতিবন্ধী জীবনে সীমাহীন কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে তিনি এখনো চেতনার জ্ঞানের কূপিতে আগুন জ্বালান। আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য আর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলেও দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন সৃজনশীল এ মানুষটির ভূমিকা সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি যে সমস্ত সম্মাননা পদক পেয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সিলেট ছড়া পরিষদ পদক ১৯৮৮ইং, সিলেট মুসলিম সাহিত্য পরিষদ পদক ১৯৮৮ইং, গ্রামীণ প্রতিভা একাডেমি পদক ২০০২ইং, সিলেট, জাতীয় আধ্যাত্মিক কবিতা পরিষদ হতে আধ্যাত্মিক পদক ২০০৪ইং, ঢাকা, নূর আহাম্মদ ইঞ্জিনিয়ার মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় হতে পদক ২০১৪ইং, মানব অধিকার সংগঠন হিউম্যান ফাউন্ডেশন (বি.এইচ.আর.এফ) পদক ২০১৪ইং, ফটিকছড়ি ফাউন্ডেশন হতে পদক ২০১০ইং এবং নবীন চন্দ্রসেন স্মৃতি পদক ২০১১ইং ইত্যাদি। তার অজস্র রচনা প্রকাশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। একথা বলতে দ্বিধা নেই আমাদের দেশের সব কিছুই রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক। মনে হয় ঢাকা ছাড়া আর বাংলাদেশ নেই। রাজধানী ঢাকা হলেই সব জাতীয় আর বাহিরে হলেই তা আঞ্চলিক। তাই চট্টগ্রামে অবস্থানের কারণে লেখক আফছার উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী’র মতো প্রতিভাবান ব্যক্তিরা জাতীয় পর্যায়ে কোনো প্রচারই পান না।
আমরা আশা করি তার সাহিত্য কর্মের জন্য তাঁকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার অথবা একুশ পদক দিয়ে সম্মানিত করা গেলে তার প্রতি সুবিচার করা হবে এবং পাশাপশি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাদের যথার্থ মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী।







Discussion about this post