” আমরা বেহেস্তে আছি ” ।
— মোঃ কামরুল ইসলাম।
বেহেস্ত বা জান্নাত সম্পর্কে যার কোন ধারনা নেই তার মুখে বেহেস্তের গল্প বলা বা কোন জাতিকে জান্নাত বা বেহেস্ত নিয়ে ভুল তথ্য দেয়া এক ধরনের চরম মানসিক উন্মাদনা ও ঐ জাতিকে মুলত অপমান করার সামিল।
যে দেশের আপামর সাধারন মানুষ চরম অনিশ্চয়তা দিন কাটায়,ফুটপাতে রাত কাটায়,টাকার জন্য সন্তান বিক্রি করে সে দেশের মানুষ বেহেস্তে আছে তা বলা এক ধরনের চরম মূর্খতা। আমরা বেহেস্তে আছি”এই ধরনের মন্তব্য কোন সুস্থ মানুষ কখনও করতে পারে না।আমাদের দেশের বর্তমান সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা এতই দূর্বিসহ সংকটাপন্ন যা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুলত বেহেস্ত বা জান্নাত শব্দের অর্থ উদ্যান,বাগান,সুখময় স্থান ইত্যাদি।
গনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সব নিয়মভঙ্গ করে যদি কেউ অসম কর্মকান্ড করে বা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে জনগনকে বোকা বানিয়ে দিনের পর দিন মিথ্যে তথ্য দিয়ে উন্নয়নের শ্লোগান তুলে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কুক্ষি গত করে রাখে তাদের পক্ষে এই ধরনের মন্তব্য ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকের সাথে প্রহসন বা অপমান করা বৈ অন্য কিছু নয়।
এই পার্থিব ক্ষণস্থায়ী জীবন কখনও বেহেস্তের সাথে তুলনা হতে পারে না।আমাদের জীবন অবসানের পরই যা পাওয়া বা না পাওয়া বিষয়টি জড়িত যা আমাদের ইহলোকিক কর্মফলের উপর নির্ভরশীল।
মুলত একমাত্র মুমিন বা মুত্তাকির জন্য অনন্ত সুখময় চিরস্থায়ী জীবন উপভোগে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন
যে সুসজ্জিত আবাস প্রস্তুত করে রেখেছেন সেটি জান্নাত বা বেহেশত।
জান্নাত সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- ‘তোমরা তোমাদের প্রভু পরওয়ারদিগারের ক্ষমা লাভের প্রতি দ্রুত ধাবিত হও এবং সে জান্নাতের প্রতি যার আয়তন আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সমান।’
(আল ইমরান-১৩৩)
মহান আল্লাহ বলেন,‘হে মুহাম্মদ! আপনি সুসংবাদ প্রদান করুন যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে।
(বাকারা-২৫)।
জান্নাত কেমন হবে সেই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘জান্নাতে তোমাদের মন যা চাইবে তাই দেয়া হবে এবং তোমরা সেখানে যা চাইবে তাই পাবে।’(হা-মীম সিজদা- ৩১)
পবিত্র কোরানে আল্লাহ বলেন, ‘মুত্তাকী লোকদের জন্য ওয়াদাকৃত জান্নাতের নমুনা হলো এই যে,তাতে রয়েছে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণাসমূহ, চির সুস্বাদু দুধের প্রবাহ এবং পানকারীদের জন্য বিশেষ স্বাদ যুক্ত পানীয়ের প্রবাহ এবং বিশুদ্ধ নহরসমূহ। ঝর্ণাধারা প্রবাহমান যা হবে স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন মধুর।
(মুহাম্মদ-১৫)
হযরত আবু হোরায়রা (রা.)হতে বর্ণিত,নবী করীম (সা.)বলেছেন,আল্লাহ বলেন আমি আমার নেককার বান্দা দের জন্য জান্নাত বা বেহস্তে এমন সব নিয়ামত তৈরি করে রেখেছি যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শুনেনি এবং কোনো অন্তঃকরণও তা সম্পর্কে যারা কোনো ধারণা রাখে না।
(বুখারী,মুসলিম)
একদা আল্লাহর রাসুলকে এক সাহাবী এসে জিজ্ঞেস করলেন,হে আল্লাহর রাসূল,জান্নাত সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিন। কী দিয়ে জান্নাত নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন,‘তার দেয়ালের একটি করে ইট সোনা দিয়ে এবং আরেকটি ইট রুপা দিয়ে নির্মিত। তার সিমেন্ট হলো উন্নত মৃগনাভী, তার প্লাস্টার ইয়াকূত ও মোতি এবং তার মাটি ওয়ারছ (নামের সুগন্ধি) ও জাফরান। যারা এতে প্রবেশ করবে তারা অমর হবে; কখনো মারা যাবে না। সুখী হবে; অসুখী হবে না। তাদের যৌবন শীর্ণ হবে না। আর তাদের কাপড় ছিন্নভিন্ন করা হবে না।’
[মুসনাদ আহমদ : ৯৭৪৪; মুসনাদ দারেমী)।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,‘স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তাই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী।’
(সূরা আয্-যুখরুফ,আয়াত : ৭১)
বেহেস্ত বা জান্নাত এমন ভাবে নির্মিত হয়েছে যা কেউ কখনও শুনেনি,দেখেনি,কোন অন্তঃকরণ যার সম্পর্কে কোন ধারনা রাখে না সেই আমরা যদি বলি আমরা বেহেস্তে আছি,বিদুৎ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফেরি করলে ও কেউ বিদুৎ কিনবে না,আমরাই উন্নয়নের রোল মডেল, পৃথিবীর উন্নত দেশ সমুহকে আমরা ঋণ দেবো,জনগন এর টাকায় পরিচালিত মহান সংসদে গানে মত্ত থাকি, টুস্ করে নদীতে ফেলে দেবো এই ধরনের মন্তব্য যা বঙ্গ বন্ধুর ও মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলাকে কলংকিত করে।
সত্যিকার অর্থে বর্তমানে বেহেস্ত খেতাব প্রাপ্ত এ দেশের মানুষ আজ দিশেহারা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি,জালানী তেলের মুল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
জালানী তেলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষেত খামার কলকারখানায় ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ এর ওপর।
দ্রব্যমূল্য যখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায় তখন শুধু দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষজন নয়,এর প্রভাব পড়ে নিম্ম মধ্যবিত্ত,মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী পর্যন্ত।
বিশ্ব বাজার পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে অযোক্তিক ভাবে জালানী তেলের দাম বৃদ্ধি যা মোটেই শুভ হয়নি। অনেকের মতে,সরকারের অব্যবস্থাপনা,অদক্ষতা চরম দূর্নীতির কারনে চিকন,মোটা চালের দাম পেঁয়াজের দাম, ব্রয়লার মুরগির দাম,ডিমের দাম সয়াবিন তেলের দাম,আটার দাম,চিনির দাম সহ সব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে।
এসব পণ্য ছাড়াও মাছ-মাংস,সবজি,মসলাসহ প্রায়
সব রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই আগের চেয়ে অনেক গুন বেড়েছে। দেশের প্রচলিত সব আইন,নিয়ম কে তোয়াক্কা না করে বারবার জালানী তেলের দাম, গ্যাস,পানি সহ বিদ্যুৎ এর দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন সেবার মূল্যও অনেক গুন বেড়েছে যার প্রভাব পড়ছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে।
অনেকে বিদ্রুপ করে বলছেন এ দেশে কোন গনতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু নেই।
কোন গ্রাহক খুচরা বিক্রেতাদের কাছে যে কোন পণ্য মূল্যের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তারা জানায় পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই তাদেরকে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এক্ষেত্রে তাদের কোনো হাত নেই। বর্তমানে চালের এই এই ভরা মৌসুমে ও অসাধু ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার টন চাল অবৈধভাবে মজুদ করে রাখছে,দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে একবার বাড়লে তার দাম আর কখনও কমে না। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার এই নাজুক পরিস্থিতি বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। এদিকে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ছে। বিগত দশকে সরকার যত উন্নয়নের গল্প জনগনকে শুনিয়েছে অনেকের মতে তা ছিল অসত্য। আজকের বাস্তবতা তার নমুনা মাত্র।মুলত বিগত দশক বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ধণীক শ্রেনী নির্ভর।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের মতে,পদ্মা সেতু,ট্যানেল,
বড় বড় ফ্লাই ওভার,মেট্রোরেল এইগুলো ছিল লোক দেখানো।এই সব প্রকল্পের প্রকল্প ব্যয় বিভিন্ন অজুহাতে কয়েকগুন বাড়ানো হয়েছে।
অনেকের মতে,উন্নয়নের আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে প্রাচার করা হয়েছে।
দেশ অনেকের মতে,দেউলিয়ার হওয়ার পথে।বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়ে আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল হতে ঋণ নিয়ে ও বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট সমস্যার সমাধান করা একেবারে অসম্ভব বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
অনেকের মতে সরকারের অদক্ষতা অব্যবস্থাপনা নজির বিহীন দূণীতির কারনে দেশ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। কাজেই ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি,মানুষের সীমা – হীন দুর্দশা আর মুদ্রাস্ফীতির ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের জেগে থাকা ক্ষণিক অর্থনীতি শিগগিরই ভেঙে পড়বে তা মাত্র সময়ের ব্যাপার।
কাজেই অবান্তর,অযোক্তিক,অসত্য কথা পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ভালবেসে সকল ভুল হতে শিক্ষা নিয়ে জনগনের পাশে থেকে জনগনকে সাথে নিয়ে এখনই সময় সরকারকে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার।
লেখক — কবি,প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যম কর্মী।







Discussion about this post