মনে পড়ে সেই কথা, তার কপালের সেই টিপ আর তার বন্ধুকে দিয়ে পাঠানো চিটির খামের সেই ডাক টিকেট আজ দুটো,ই হাতছানি দেয় আমাকে অজানায় হারিয়ে যেতে। সেই নিষ্পাপ টিপ আর এখন নারী টিপের মধ্যে পার্থক্য অসীম।সে নারী, আজকের নারীর মধ্যে অনেক ব্যবধান।
নবম শ্রেনী হতে উত্তীর্ণ হয়ে যখন দশম শ্রেনীতে- শ্রেণীর প্রথম বালক আর তখন দেখতে ও মন্দ নয় আর ঐ সময় দু,দুটো প্রেমের প্রস্তাব তেমন মন্দ ছিল না। তাদের কপালে মাঝে মাঝে টিপ ছিল তবে সঠিক রং এ সময়ে বা বয়সে এসে মনে করতে পারছি না।সে কয়েক দশক আগের কথা।
কপালে টিপ,খোলা চুল,কাজল কালো চোখ,সে ঠোঁটের নিচে এক চিলতে হাসি কার না ভালো লাগে। আজ সে হাসি সহজে মিলে না। বাস্তবতা বড় নির্মম কেননা এক সময় মানুষের সব আবেগের আনাগোনা বন্ধ হয়,মাঝে মাঝে সে সব কথা মনে পড়ে,পড়তে পারে,ই তবে কিছুই করার থাকে না।সেই যাই হোক,গত কয়েকদিন ধরে সে লাল টিপ অনেকের মতে,শাহবাগী লাল টিপের কথা আমার মনে পড়ছে বারবার।
মনে পড়ছে লাল টিপ পরিহিত সেই মেয়ের কথা যার কন্ঠের সেই শ্লোগান,দেহ আমার সিদ্ধান্ত আমার ” তার সাথে সে সহ অনেক নারী নানান দাবীতে রাজপথে সোচ্চার তাকে সহ অনেককে দেখলাম নাভি দেখিয়ে কপালে লাল টিপ পরে বলছে- চেয়েছিলাম হিস্যা, হয়ে গেলাম বেশ্যা।
নারী প্রতিবাদী হবে, তার অধিকার আদায় করে নিবে আমরা তা চাই। কবি নজরুলের ভাষায়- পৃথিবীর যা কিছু চির কাল্যান কর অর্ধেক তার করিয়াছে, নারী অর্ধেক তার নর।
পবিত্র কোরানে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে।
বাবা আদমকে সৃষ্টি করে শ্রীলংকার জমিতে আর মা হাওয়াকে সৃষ্টি করে জর্ডানের মাটিতে পাঠিয়ে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে,দু জনের সাক্ষাৎ করতে হবে আরাফাতের ময়দানে।
জর্ডান থেকে আরাফাতের ময়দান ৭৫-৮০ মাইল আর আদমকে বলা হলো পাড়ি দিতে হবে হাজার হাজার মাইল। নারী আর পুরুষ কখন ও এক নয় কখনও হতে পারে না।পবিত্র কোরানে নারী,পুরুষ, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, করণীয় সহ বিভিন্ন আয়াতে তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
জানা যায়, হাজার হাজার বছর ধরেই বিশ্বের অনেক দেশের নারীদের মধ্যে টিপপরার রীতি চালু রয়েছে।এটা শুধুমাত্র বাঙালি জাতির বা হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যাপার ছিল তা নয়। আঠারো শতকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মায়ানমা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার নারীরা টিপ ব্যবহার করতেন। সেই সময় থেকে সব ধর্মের নারী দের মধ্যে টিপ পরার প্রচলন ও ছিল।
মুসলমানদের মধ্যে টিপ ব্যবহারের প্রচলন ছিল কেননা ইসলামে ও টিপ পরা নিষিদ্ধ করা হয়নি। একজন মুসলমাননারী টিপ পরতে পারবেন বা পারবেন না এ ব্যাপারে কোরান ও হাদিসে কোন দিক নির্দেশনা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যে কোন নারী, নারী তার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য পরবেন তাতে কোন সমস্যা নেই। মুসলিম নারী টিপ ব্যবহার করবেন তবে তা তার নিজস্ব অঙ্গনে মাহরাম পুরুষদের (যে পুরুষদের সামনে দেখা দেয়া বাধা নেই ) তাদের সামনে বা অন্য নারীদের সামনে পরতে পারবেন। এটা যেহেতু নারীর সৌন্দর্য কে বহুগুন বাড়িয়ে দেয় কাজেই বিয়ের পর তার স্বামীকে খুশি করতে শুধু তার জন্য তার নিজস্ব অঙ্গনে ব্যবহার করা যেতে পারে,যা উত্তম।
ইতিহাসের অলিগলি” বই হতে জানা যায়,”কপালে টিপ বাঙালি তথা আধুনিক বাঙালি নারীর প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থান কাল আর পাত্র, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নারীরা পুরুষের তুলনায় সৌন্দর্য চর্চা করেন বেশি।বাঙালি নারীদের ক্ষেত্রে কপালে বড় একটি টিপ দেয়া, তার সৌন্দর্য চর্চার অন্যতম এক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। পাক- ভারত উপমহাদেশে এটিকে প্রায় প্রতিটি নারী টিপকে সাজ সজ্জার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপুর্ন মনে করে।এটি সত্যি যে,বাঙালি নারীর কপালে টিপ তার সৌন্দর্যকে বহুগুন বাড়িয়ে দেয়।
কেউ কেউ বলছেন, এই রীতি চালু হয়েছে প্রায় ৯৫০০ থেকে ১১৫০০ বছর আগে থেকে,যাকে বাল্মীকি যুগ
বলা হতো। তৎকালীন সে সময় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ বা শ্রেণীভেদ মাত্রা প্রবল ছিল।”ব্রাহ্মণরা উচ্চ শ্রেণীর তারা ঈশ্বরের অতি নিকটজন, পূত-পবিত্র। পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে তারা কপালে সাদা তিলক (চন্দন তিলক) দিতেন। এখনও দেন।” ক্ষৈত্রিয় হলো যোদ্ধা শ্রেণি, তাদেরকে বীর হিসাবে গণ্য করা হতো। ক্ষিপ্ততা, হিংস্রতা ও সাহসের প্রতীক হিসাবে তারা কপালে লাল টিপ দিতো। বৈশ্যয় শ্রেণির লোকজন হলো ব্যবসায়ী, পেশাই হলো ব্যবসা। এরা কপালে হলুদ রঙের টিপ ব্যবহার করতো।আর সমাজে সবচেয়ে নিচু লোকজন হলো শূদ্ররা। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল কালো রঙের টিপ। তারা কপালে কালো টিপ ব্যবহার করতে বাধ্য হতো।
নারীদের মধ্যেও ভিন্ন মাত্রার শ্রেণিভেদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।শ্রেণিভেদ অনুসারে তাদের বেলাতেও এই টিপ ব্যবহারে একটু ভিন্নতা ছিল।সেই সময় যেসব নারীদের মন্দিরে উৎসর্গ করা হতো, তাদের চিহ্নিত করার জন্যও টিপ দেয়ার রীতি চালু হয়েছিল। আবার উচ্চ বর্ণের বিবাহিত নারীরাও বিয়ের চিহ্নস্বরূপ কপালে সিঁদুরের মত টিপ পড়তো। সেই যাই হোক বর্তমানে বাংলাদেশ সহ প্রায় সবর্ত্র টিপ সবার কাছে সাধারণ সৌন্দর্য চর্চার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে।”
তাফসীরে মা-রেফুল কুরআন, হযরত ইবরাহিম (আঃ) মূলগ্রন্থ, তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩-১২৪; ছালাবী,আদি গ্রন্থ, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠাঃ ৮১, আদি ইসলামী ইতিহাস, ইবনে কাসীর গ্রন্থে বলা হয়েছে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে যখন আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য নমরুদ ৮ মাইল পরিমাণ জায়গা আগুন জ্বালালো ( নাউযুবিল্লাহ ) তখন একটা নতুন সমস্যা দেখা দিল নমরুদ বাহিনির জালানো আগুন নিয়ে। আগুনের সেই উত্তাপ এতই বেশি ছিল যে তার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। তাই একটা চরক বানানো হল যার মাধ্যমে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে দূর থেকে ছুড়ে আগুনে নিক্ষেপ করা যায়। কিন্তু রহমতের ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা চরকের এক পাশে ভর করে থাকায় চরক ঘুরানো যাচ্ছিল না। তখন শয়তান এসে নমরুদকে কুবুদ্ধি দিয়েছিল যে, সমাজে যারা অনৈতিক কার্যকলাপ করে এমন কয়েকজন মেয়ে এনে চরকের সামনে বসিয়ে দিতে, কারণ এ অবস্থায় রহমতের ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা থাকতে পারবেন না। তাই করা হলো এবং ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা চলে গেলেন, আর ঠিক তখনি তারা মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে আগুনে নিক্ষেপ করতে সক্ষম হলো। কিন্তু আগুন আল্লাহ্ পাক উনার হুকুমে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে জালানোর বদলে ফুলের বাগান হয়ে গেলো, পরবর্তিতে ঐ মেয়েগুলোকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দান করা হল যে পতিতা মেয়েদের কারণে রহমতের ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা চরক ছেড়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন,এবং তাদের মাথায় তীলক পরানো হল। যেটা এখন আমাদের কাছে টিপ নামে পরিচিত যা মেয়েরা নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে ব্যবহার করে।এ ঘটনাটি সত্য নয় বা হাদিছটি সত্য নয় বলে অনেকে মত দিয়েছেন।
আমরা জানি,ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম।এখানে নারী ও পু্রুষের অধিকার ,সম্পত্তিতে অধিকার , পারিবারিক অধিকার এমনকি কার পোশাক কেমন হবে,কে কি পরিধান করবে,কার সাজ সজ্জা কেমন হবে সব বিষয়ে কোরান, হাদিছে বিস্তারিত বর্ণিত আছে। নারী অধিকার কমিশনের আন্দোলন কারীরা ভাবছে,তারা আধুনিক আসলে তা নয়, আধুনিকতা থাকে মানুষের চিন্তায় জানতে হবে ইসলামের ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের হাল চাল।যৌন অধিকার কখনও স্বাধীনতা নয়।
যৌন স্বাধীনতা জীবনে বিশৃংখলা ডেকে আনবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সমাজকে ধ্বংস করবে যে কোন জীবন কে অস্থিতিশীল করবে,বংশবৃদ্ধি ব্যবস্থা চিরতরে হয়ে ধ্বংস হয়ে হবে পুরুষ সংসার করতে চাইবে না।পরিশ্রম করবে,টাকা রোজগার করবে,যখন মন চাইবে দিনে দু চার পাঁচজনের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে এতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা পুরো নষ্ট হবে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধ, নারীর প্রতি যে সম্মান তা চির তরে হারিয়ে যাবে,নানা রোগ ব্যাধি তৈরী হবে, মহামারি আকার ধারন করবে আর নারী পন্যে রূপ ধারন করবে। ক্ষণিক সময় আরাম আয়েশ করে অপ্রয়োজনীয় মনে করে পু্রুষ তাকে ফেলে দিবে, পুরো সমাজ ব্যবস্থা পুরো ভেঙ্গে যাবে।সংসদে নারীর আসন,ক্ষমতায়ন নিয়ে যে দাবি তাও হাস্যকর। বিগত শাসনামলে প্রধান মন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, শিক্ষা মন্ত্রী তারা ছিল সবাই নারী। তারা শুধু ফ্যাসিবাদকে লালন করে নাই পুরো দেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন মানে ফ্যাসিবাদকে নতুনভাবে জম্ম দেওয়া।নারীর স্বাধীনতা মানে নারীর মনে যা চায় তা করা নয়।ইসলামে নারীর যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে তাকে সম্মান করে নারী পুরুষের শ্রদ্ধোবোধকে জাগ্রত করে ইসলামে অপছন্দনীয় সব কর্মযজ্ঞ পরিহার করে সকল নারীকে পুরুষের হাতে হাত রেখে অযৌক্তিক সকল অধিকারের নামে আন্দোলন করা হতে বিরত থেকে
এ সমাজ গঠনে তাদের ভুমিকা রাখতে হবে।
লেখক – মোঃ কামরুল ইসলাম।
কবি,প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী।







Discussion about this post