বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বন্দর এলাকার ৩৮ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “মাদ্রাসা-এ তৈয়বিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল”-এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি আজ যেন নগর ব্যবস্থাপনার অবহেলা, উদাসীনতা ও দীর্ঘদিনের অযত্নের এক নীরব সাক্ষী। একসময় পানি প্রবাহের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই খালটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে। দুর্গন্ধ, আগাছা, প্লাস্টিক বর্জ্য ও নানা ধরনের ময়লার স্তূপে খালটির স্বাভাবিক অস্তিত্বই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গতকাল মাদ্রাসাটির এক শিক্ষার্থী অসাবধানতাবশত খালে পড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত আশপাশের মানুষের তাৎক্ষণিক নজরে আসায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়–যদি ঘটনাটি কারও চোখে না পড়ত? যদি কয়েক মিনিট দেরি হতো? তাহলে হয়তো আরেকটি প্রাণহানির সংবাদ শুনতে হতো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অতীতেও মহানগরের একটি খালকে ঘিরে ঘটেছে হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। এক কিশোর খালে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজে পেতে প্রশাসন ও স্বজনদের দীর্ঘ সময় ধরে হিমশিম খেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে উদ্ধার করা হলেও জীবিত নয়, মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেই মর্মান্তিক স্মৃতি আজও এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খালটি যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে না। খালের দুই পাশেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিন মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ পথচারী চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে খালটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায় বহুগুণ।
মাদ্রাসা-এ তৈয়বিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিলের অধ্যক্ষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই খালটি এখন শুধু পরিবেশ দূষণের কারণ নয়, এটি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য খালটি দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই যদি এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে, তাহলে তা শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি উদ্বেগজনক বিষয়। তাই তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শ্রদ্ধেয় মেয়রের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
আজ সময় এসেছে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে, একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর আরেকটি প্রাণহানির শোক বহন না করে, এখনই প্রয়োজন খালটি সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন করা।
কারণ একটি সভ্য নগরীর পরিচয় শুধু তার উঁচু ভবন বা উন্নয়ন প্রকল্পে নয়; বরং তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, পরিবেশের সুরক্ষা এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। বন্দর এলাকার এই খালটি যেন আর কোনো পরিবারের কান্নার কারণ না হয়–এটাই আজ স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক সমাজের প্রাণের দাবি।






Discussion about this post