বহতা কলম
নজরুল ইসলাম হাবিবী
(লন্ডন থেকে)
যে ভাবেই হোক আমাদের জন্য সুসংবাদ যে আমরা অনেকগুলি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, বার্ষিক প্রকাশনা ও অন লাইন গ্রুপে লিখতে পারছি। এতে করে লেখক ও পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, উন্নত হচ্ছে লেখার মান, সর্বোপরি বিকশিত হচ্ছে বাংলা সাহিত্য। তবে, এ ক্ষেত্রে সম্পাদক ও পরিচালকদের প্রতি অনুরোধ করব, আপনারা সাহিত্যের পাশাপাশি সমাজসেবাকে গুরুত্ব দিন। মানুষের জন্য বেশি বেশি লিখতে বলুন।
আজ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষের দুর্ভোগ, মনুষ্যত্বহীন, দয়া-মায়া প্রাণহীন সমাজ ব্যবস্থা। আমরা ফেজবুকে যত প্রেমিক, মনের পাখির জন্য যত দেওয়ানা, মানুষের জন্য যত কাঁদি বাস্তবে তত নই। অনেক লেখক, বক্তা, ধর্ম প্রচারক শব্দের মাধ্যমে ফেজবুকে, মাইকে যত ঝাঁকুনি দেন, সরব, যতটা হাজী মোহাম্মদ মোহসিন, বাস্তবে তিনি ততটাই নীরব।
শিক্ষা ও সম্মোহনের সমন্বয়হীনতা আমাদেরকে মনের দরজা খুলতে নিষেধ করে। দর্শনের আদর্শ হল তত্ত্ব, তথ্য বা যুক্তির সন্ধান করা। এখানেই থাকে দ্বন্দ্বের ছোট শ্যালিকা । সে ডেকে নেয় একটু অভিসারে। অভিসার অভিপ্রায়ের প্রথম অঙ্ক অভিলাষ। এখান থেকে অতি আধুনিকতার পচন শুরু।
তথাকথিত উন্নত দেশ, উন্নত রাষ্ট্র নীতি, উচ্চ শিক্ষাই যেন আমাদের সমস্যা। আমাদের পূর্ব পুরুষের যুগে অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রীজ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, অবিশ্বাসও ছিল না । আমরা হাজার তলা বিল্ডিং করে যত উপরে উঠছি মানবতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সিঁড়ি বেয়ে তত নিচে নামছি। কোথায় যাচ্ছি? উত্তর সবার জানা। কিন্তু কী আশ্চর্য, কেউ থামছে না! এরা কিন্তু মানুষ।
তাই এর জন্য দায়ী মানুষ।
সাধু বা সন্ত্রাসী মানুষের মধ্যে থেকেই তো হয়। জলে স্থলের বিপর্যয় মানুষের সৃষ্টি। যুদ্ধ- বিগ্রহ মানুষের সৃষ্টি, মরে মানুষেরাই। এক একটি যুদ্ধ রেখে যায় অগণিত লাশের হাড়, পথে পথে লাল লাল রক্ত এবং আকাশের নীলে কান্নার ঘোমট মেঘ।
বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়ার যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছে, এর জন্য বিজ্ঞান সরাসরি মানুষই দায়ী বলে মনে করে। ভূমিকম্প, ভৃমিধ্বস, কঠিন রোগ শোক, সাইক্লোন, সাইমুম বা টর্নেডো এবং দাবানল বা পাহাড়ি আগুন সবই মানুষ-সৃষ্ট। তাই এখানেই আমাদের কলম ধরা দরকার। আমি মনে করি, লেখকদের কলম বুলেটের মত থেতলিয়ে দিতে পারে নতুন নতুন হিটলারের বুক। কলমের নিব আর বন্দুকের অগ্রভাগ লক্ষ্যভেদী।
সাউথ আফ্রিকার কথা আমরা জানি। সে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সব কৃতিত্ব কলম সৈনিকদের, অনেক অনেক কালো নজরুলের বিষের বাঁশি বর্ণফুল ঢেলে দিয়েছিল বর্ণবৈষম্যের নিকোটিনে; যদিও মানুষ কিছুটা ভুল করে নেলসন ম্যান্ডেলাকে বুঝে। রক্ত দেয় একজন, ক্ষমতার তখ্তে আরেকজন। অবশ্য, এত কঠিন কথার সমাধান কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন এর নেই। যদিও কষ্টের ক্ষতে সমবেদনা আছে।
কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন বড় কোন সংগঠন নয়। আমাদের কথাবার্তা আকাশ থেকে আমদানি করা হয় না। আমরা ছোট ছোট সেবা ও শব্দ নিয়ে কাজ করি। বিশ্বের অগণিত মানুষের কষ্টের বোঝা বহনের যোগ্যতা কলম রাখে না। অনাহারী ভুখা নাঙ্গার দায়িত্ব পালন করার শক্তি আমাদের নেই । আমরা চেষ্টা করছি, আহ্বান জানাচ্ছি।
তখনকার দিনে গ্রামে দেখেছি, কারো ঘরে আগুন লাগলে অন্য গ্রামের বৃদ্ধটিও “আগুন আগুন” বলে মানুষকে সজাগ করতেন দৌঁড়ে গিয়ে আগুন নেভানোর জন্য। তিনি যেতে পারবেন না, কিন্তু তামাক নিয়ে বসে থাকেন নি। জ্বলন্ত আগুনে এক বালতি পানি না দিয়েও তিনি পূর্ণ নেকী পাবেন।
এ ভাবে আমরা কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন এর নামে বিবেক, মনবল ও ধনবলের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
আমিই বা তার কতটুকু পারি? বৈরী পরিবেশ, নিষ্ফলা দুটি হাত, হাজার অযোগ্যতার মদিরা আমাকে অক্টোপাসের মত আবেষ্টন করে আছে, যেখানে পঙ্গুত্বের সমূহ বিশেষণ সমাজের সহচর।
আপনি আপনার প্রিয় পত্রিকায় লিখুন। বর্তমানে অনেক ভাল ভাল প্রকাশনা আছে। ফেজবুকে বেশ কিছু ভাল গ্রুপ আছে। সব গ্রুপই সমাজ সাহিত্যের জন্য কাজ করছে। এদের আমি অভিনন্দন জানাই। আপনি রাগ না করে, অভিমান না করে, অলস না থেকে এদের সাথে কাজ করুন। আর প্রকাশনা যদি আপনার মনের বা চিন্তার বিরোধী হয় সহসা এড়িয়ে চলুন। অন্য গ্রুপের জন্য কিছু করুন, বসে থাকার সময় নেই। বিশ্বের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য আপনার অবস্থান থেকে অবদান রাখুন এবং এখনই।
কিছুক্ষণ আগে আপনি স্বীকার করেছেন জলের স্থলের বিপর্যয় মানব সৃষ্ট। একই ভাবে কলম বা সাহিত্য কেন্দ্রীক অপসৃষ্টির দায়ভারও আপনাকে নিতে হবে বৈকি। কারণ, মানুষের আত্মীক বিপর্যয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কম নয়- বেশি। প্রাকৃতিক অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, কিন্তু মানুষের সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক ও শৈক্ষিক অধঃপতন নিয়ে যায় চূড়ান্ত ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে।
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী
21.09.’19
লন্ডন।





Discussion about this post