বাংলা শব্দের ভোজ বিলাস
নজরুল ইসলাম হাবিবী
অনেক দেশ এবং ব্যক্তি শব্দের জাত-পাত বিচার করে, শব্দকে পড়ায় ধর্মের পোষাক। তা সাহিত্যের বিচারে সমর্থনযোগ্য হলেও, দেশীয় বৃহৎ শব্দভান্ডারের প্রয়োজনে নমস্য নয়।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে প্রায় প্রতিদিন হেরে যাচ্ছে ভাষার আদীরূপ। সেখানে আমরা ভাষার জাত-পাত নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি না করে পারি।
আরবী, বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত শব্দ বলেই শব্দটি হিন্দু, মুসলিম, ইংরেজ ও বাঙ্গালী হয়ে যায় না।
একটি ইসলামী সঙ্গীতে মোহরম, ঈদ, ঈদগাহ, আল্লাহ, নবীর নাম আসাটা স্বাভাবিক। সেখানে ভাবের বিশ্লেষণে লেখক শব্দের সন্ধানে যান। একই ভাবে রাম-সীতার কাব্য-কথায় কৃষ্ণ, ভগবান, পূজো ধরণের শব্দ আসবেই। এ রকম শব্দ ছাড়া হিন্দুধর্মীয় সাহিত্য হতে পারবে না। কিন্তু যেহেতু, একজন মুসলমান মসজিদে পূজো দেয় না, কুরবানীর সময় দেয় না বলী, তাদের নবীর উপর প্রশংসাবাণীর নাম কীর্তন নয়, কখনো মুসলমানের আল্লাহ হরি, রাম ও ভগবান হয় না, হওয়াতে মন ভরে না, ঠিক অনুরূপ ভাবে, একজন হিন্দু মন্দিরে এবাদত করে না, তাদের দেবীর নামে রচিত গাঁথা দরুদ নয়। একই ভাবে মনসার নামে পাঁঠাবলি কুরবানী হওয়া সহজ নয়। হিন্দুদের বলীর মাংসে মুসলমানের জিহ্বায় লোলুপতা আসে না, মজা জাগে না। গোশত পেলে দোস্তের মত মনে হয়। হিন্দু ভায়েরা মাংসে যে স্বাদ পান, তা গোশতে পাবার কথা নয়। তাদের মাংসে যে রুচী, তা গোশতে নেই। তুলসী পাতার জল হিন্দুদের যে রকম প্রাণের পিপাসা মেটায়, মুসলমানের কাছে মহা পূণ্য-পবিত্র আরবের জমজমের পানিতে তা করবে বলে তারা বিশ্বাস করে না।
দেশ ভেসে যায় বন্যার জলে, না বন্যার পানিতে, তা নিয়েও আমাদের দেশে রাজনীতি হয়, হয় গরম গরম রচনা। মাইকে বক্তৃতা চলে, অন্যদিকে মানুষ কাঁদে ক্ষিদে! গরু-ছাগল ভেসে যায় নোনা দরিয়ায়। ফতোয়ার ফয়সালা হয় না। অথচ, আমরা জল পানি উল্লেখ না করে, ‘বন্যায় দেশ ভেসে যায়’ লিখতেও পারতাম। আমার একটি ছড়ায় আছে ‘দেশ ভেসে যায় বন্যায়/ ব্যাংক মেরে ব্যাংককে যায় আমার প্রথম কন্যায়’।
কিন্তু না, আমরা সাহিত্য বা শব্দ নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করেই সাহিত্যিক হই। কারণ, আমরা মনে করি, জোর করে টেনে এনে শব্দকে জাতির টুপি-টিকি না পরালে কি আর সাহিত্যিক হওয়া যায়?
কোন একজন তার ছেলেকে বাজার থেকে মাছ-গোশত আনতে আদেশ করতে পারে। ঘরোয়া ভাবে গোশত শব্দ রুচিকর। তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু একজন লেখক তার লেখায় মাছ-মাংস বলবেন। এটি সুন্দর, যুক্তিগ্রাহ্য, মানানসই এবং অর্থবহ। মাছ-গোশতে আছে জিহ্বার স্বাদ। মাছ-মাংসে আছে সাহিত্যের উপকরণ। মাছ-মাংশ শব্দদ্বয়ে মা মা ছন্দময় ধ্বনীটি মনে- মননে অনুরণন আনে। গোশত ভরায় পেট, মাংস আনে সাহিত্যে শক্তি, শর্করা ও ভিটামিন।
যেহেতু, পেট আমাদের বাঁচায়, তাই দরকার গোশতের। আর এই বাঁচাটা যেহেতু সমাজ, সভ্যতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য তাই মাংসও খাওয়া চাই নিয়মিত-পরিমিত। মাছ-গোশত অথবা মাছ-মাংসের বিষয়টি এ ভাবে মেনে নিলে শব্দে জাত-পাত নিয়ে জাত্যামি আর থাকবে না।
গোশত-মাংস খেতেও পারব, লিখতেও পারব।
(২) আমাদের বাংলাসাহিত্যে অনেকে মধ্যপন্থী হতে চেষ্টা করেছেন। সফল হন নি। তারা শব্দের জাত-পাত রক্ষা করার নামে মাঝামাঝি একটি প্রতিশব্দকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে, শব্দটি ডাকে সাড়া দিয়েছে, এসেছে, বসেছে, কিন্তু কোন কথা বলতে পারে নি। কোন ভূমিকা রাখতে পারে নি। যেন নিরহ-নির্বোধ মেহমান। নির্বোধ অতিথি যেমন বড় কোন সভা-সমাবেশে নিজেকে অপরাধী মনে করে, লজ্জা পায়। শব্দটিও সে রকম। কারণ, তাকে ডেকে বসানো হয়েছে ঠিকই কিন্তু যথার্থ মর্যাদা দেয়া হয় নি।
মুসলামানের আল্লাহ এবং হিন্দুর ভগবান এর প্রতিশব্দ প্রভু, বিভুকে মেনে নিলে সাহিত্যের আপত্তি না থাকতে পারে, কিন্তু এতে ভক্তের মন ভরে না। একজন ’আবেদ’ আল্লাহ নামে যে ঈমানী জজবা পান, একজন হিন্দু পূজাঁরী ভগবান স্মরণে যে আত্মতুষ্টি এবং তৃপ্তি পান তা প্রভু-বিভুতে নেই। ‘যতই কাঁদি, তবু, প্রিয়ার মন ভরে না কভু’। মনের মজা এবং সাহিত্যের স্বার্থ এক নয়। আমার মূল বক্তব্য এখানেই।
তাই বলে, শব্দের জাত-পাত লেখক কর্তৃক নির্ণীত হওয়া কাম্য নয়। সেটা লেখকের কাজ নয়। কোন নির্দিষ্ট শব্দের প্রতি লেখকের আগাম আগ্রহ বা দুর্বলতা থাকলে লেখাটি আর সাহিত্য হয়ে উঠে না।
লন্ডনে লেখকের বই-পুস্তক সম্পাদনা করা, সাহিত্য সভায় সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা করা এবং প্রকাশনা উৎসবে কথা বলার জন্য মাঝে-মধ্যে আমি অনুরুদ্ধ হই। সুযোগ হয় তাঁদের লেখার ছত্রে ছত্রে হাঁটতে। আমি দেখেছি যে, কেউ কেউ একটি শব্দকে আদর করতে গিয়ে বাক্যে ও ভাবের গভীরতায় প্রবেশ করাটাকে কঠিন করে তুলেছেন। গতি হারাতে সহায়তা করেছে মাত্রা অনুপ্রাসকেও। খুবই সুন্দর একটি কথা বা কবিতাকে তারা স্বর্গের দ্বার থেকে বিদায় জানিয়েছেন। তখন তার কষ্টসাধ্য আরাধ্য কাজটি লেখা হলেও সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে নি।
শব্দকে আমরা ডাকতে পারি না। ভাব বিষয় ছন্দ এবং মাত্রাই শব্দকে টেনে নিয়ে আসবে। আহবান করবে, বসতে দেবে যথাযথ মর্যদায়, কথা বলতে দেবে। শব্দ আসবে আপনার স্বার্থে। যেমন মৌমাছি ছুটে যায় ফুলে নিজের গরজে । মৌমাছির মধু আহরণ নিজের জন্য হলেও তা কাজে আসে সকল সৃষ্টির, ঠিক সাহিত্য নিজের হলেও তা থেকে উপকৃত হতে হবে বিশ্বের মানব সভ্যতা। সাহিত্য আপনার জন্য নয়-মানুষের জন্য।
কোন লেখকের মাথায় লেখার আগে শব্দ চিন্তা থাকলে তিনি আর সে আবহ থেকে বের হতে পারেন না। পরিকল্পিত শব্দধারণা একটি সীমাবদ্ধতার চিত্র এঁকে দেয়। শব্দ আসবে শব্দের জন্য। জসিম উদ্দিন থেকে একটি উদাহরণ দেয়া যাক: “এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/ ত্রিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে”।
আমরা জানি, এটি ইসলামী কবিতা নয়। যদিও কবর ষোল আনা আরবী শব্দ। তারপরও লেখক শব্দটি বেছে নিয়েছেন। কারণ, বিশ্ব বাঙ্গালীরা ভাল ভাবেই শব্দটিকে চিনে এবং জানে। শ্মশানের চেয়ে কবর অনেকটা জীবন্ত । শ্মশানের ছাই আর কবরের মাটির মরমিতা এক নয়। শ্মশান নির্বাক বেদনার দাহ, কবর সবাক হাড্ডির কান্না। কবরের কাছে যতটা নিবেদিত, সমর্পিত এবং বিগলিত হওয়া যায় শ্মশানের ছাই ততটা টানে না। কবর একটি চিত্র এঁকে দেয়। মনে হয় ভেতরে কে যেন আছে। শ্মশানের হায় হুতাশ আকাশে ঘুরে বেড়ায়। কবরে ত্রিশ বছর নয় যুগ যুগ ধরে কাঁদা যায়। ফেলা যায় দুই নয়নের জল। এই অর্থে আলোচ্য কবিতায় অত্যন্ত সার্থক ভাবেই শ্মশান এর স্থলে কবর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। লেখক মুসলিম বলে কবর শব্দের আমদানী করেন নি। শব্দটি এসেছে সাহিত্যের প্রয়োজনে। ভাবের মোহে। পরিস্থিতির আবহে। না হয় তিনি ’জল’ কেও জলাঞ্জলী দিতে চেষ্টা করেতন। তিনি তা করেন নি। জল এসেছে জ্বলজ্বল করে সাহিত্যকে আলোকিত করার প্রয়াসে। জল ছাড়া কবিতাটি হতো না। এখানে জল যেভাবে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে পানি তা পারতো না। শব্দের ধরণ এখানে বিবেচ্য নয়। গাথুঁনিটাই প্রধান।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখি, ইসলামী শব্দ দিয়েও একজন মুসলিম কবি একটি সার্বজনীন কবিতা সৃষ্টি করতে পারেন। অতিক্রম করতে পারেন জাত-পাতের সীমানাও। এটাই সাহিত্য চায়। আমি চাই।
(৩) রাজনৈতিক মেনোফেস্টোতে যত কথাই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা তাতে সংশোধনী আনেন। করেন সংযোজন বা বিয়োজন,-কালের এবং বৈশ্বিক প্রয়োজনে তা করতে হয়। একজন লেখকও সে রকম। নেতারা রাষ্ট্র চালান, লেখক চালান নেতার মন-মানসিকতা। নেতারা লেখা থেকে নীতি পান। তাই লেখককে কলম ধরার সময় অনেকগুলি চোখ খোলা রাখতে হয়।
পরিশেষে বলি, (প্রায়োগিক অর্থে) শব্দের জাত-পাত আছে। আছে বাড়ি-ঘর, ঠিকানা, বৈশিষ্ট, স্থান, কাল, পাত্র, শ্রেণী-বিন্যাস, রাগ বিরাগ, মান-অভিমান, দ্বন্ধ-কলহ, বিবাহ-বিরহ এবং তালাকও। এ সবই হয় সাহিত্যের প্রয়োজনে, সৃষ্টির স্বার্থে। ধ্বংস-সংঘাতের জন্য নয়। শব্দের এই বিভাজন হিন্দু-মুসলিম দর্শনের নয়। দংশনের নয়। দর্পনের। ’৪৭ সালের দ্বি-জাতিতত্ত্বের মত নয়, মাহাত্মা গান্ধির অহিংসার মত। ’৭১ এর মত একটি স্বাধীন, নির্ভেজাল রাষ্ট্র পাবার সংগ্রামের মত। শেখ মুজিবুর রহমানের ’ভাতে মারবো, পানিতে মারবো’র মত নয়।
সাহিত্যের বা সাহিত্যে বিভাজন ভাল। এতে করে নানা রকম, ভিন্ন স্বাদের এবং সাধের সাহিত্য সৃষ্টি হয়। উপকৃত হয় জাতি, সমাজ, ও সভ্যতা। তৃপ্তকর হয় শব্দ-সাহিত্যের ভোজ বিলাস। তবে, সাহিত্যিকদের বিভাজন কাম্য নয়। কাম্য হতে পারে না। ইহাতে মন্দ এবং দ্বন্ধ বাড়ে। জাতি, সমাজ ও সভ্যতার ক্ষতি হয়। শব্দ-সাহিত্যে কালিমা পড়ে, তখন মাংসও যায়, হারাতে হয় গোশতের স্বাদও।
**
আমার লেখা ‘কথার নাম লতা’ নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া।
রচনাকাল : ২৩.০৬.’১০ লন্ডন।







Discussion about this post