আমার বিদেশ ভ্রমণ
*****
পর্ব: স্কটল্যান্ড।
নজরুল ইসলাম হাবিবী
(লন্ডন থেকে )
ছাত্রজীবন থেকেই ভ্রমণ করা আমার কাছে অতি সখের এবং দুখের একটি বিষয় ছিল। কখনও ইচ্ছে করে আবার কখনও অনিচ্ছায় আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছি। অনিচ্ছা মানে স্কুল ফাঁকি দেবার জন্য । বলা বাহুল্য, আমি একজন স্কুল পলাতক ভাল ছাত্র। মাদ্রাসায় পড়ার সময় মাদ্রাসার এক হলে “ময়লানা গজব উল্লা” নামে আমার রচিত এবং অভিনীত একটি নাটক মঞ্চায়িত হবার অপরাধে আমি মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হই। সে সুযোগে চষে বেড়াই বাংলাদেশের অনেক জেলা উপজেলায়। সে অনেক কথা। অনেক ব্যথা।
ভার্সিটিতে পড়ার সময় একটি লিবিয়ান এনজিওতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রজেক্ট অফিসার হিসেবে কাজ করি, এর সুবাদেও আমি বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ করার সুযোগ পাই। শুধু শহরে বন্দরে নয় গ্রামে গঞ্জেও আমি প্রচুর ঘুরেছি। বিভিন্ন সংগঠনের আহবানে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে তথা বুদ্ধ ও হিন্দু পুজা পন্ডপে নাটক, গান ও কবিতা আবৃত্তি করার জন্য আমাকে বাংলাদেশের অনেক স্থানে যেতে হয়েছিল। আমার অনেক লেখালেখিতে সে সব স্মৃতি চির ভাস্কর হয়ে আছে।
লন্ডনে আসার পর থেকে আমাকে আরো বেশি “ভ্রমন নেশায়” পেয়ে যায়।
আমার প্রথম ভ্রমন হল্যান্ডে বা নেদারল্যান্ডে। তারপর ইউরোপের অনেকগুলি দেশ দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। ওমরাহ এবং হজ্জ করার তৌফিকও আল্লাহ পাক আমাকে দিয়েছেন।
আজকের আলোচনা স্কটল্যান্ড ভ্রমন বিষয়ক ।
2015 সালের আটাশে অক্টোবর আমি আমার বড় মেয়ে অক্ষর এবং বড় ছেলে অন্বয়কে নিয়ে স্কটল্যান্ড যাই। গিয়েছিলাম আমার মেয়ের জন্য এডিনবরা ইউনিভার্সিটি দেখতে। সে ইকনমিক্স এ পড়ার জন্য এপ্লাই করেছে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে আসা যাওয়ার টিকেট এবং থাকার জন্য হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম দুই সপ্তাহ আগে থেকেই। লন্ডন স্টানস্টেট এয়ারপোর্ট থেকে আমরা এডিনবরা নেমে সরাসরি হোটেলে চলে যাই।ঘন্টা খানেক বিশ্রামের পর মেপ ধরে বাসে করে ভার্সিটি দেখতে বেরিয়ে পড়ি।
এডিনবরা ইউনিভার্সিটি বিশাল ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত। আমি দেখছি আর ছবি তুলছি। অবশ্য, আমার কাছে পৃথিবীর সব কিছুই বিস্ময়কর। এক টুকরো টিস্যুও আমার কাছে ফেলনার নয়। আমার এ অভ্যাসটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর এবং ছেলেমি।
ক্যাম্পাস অফ ইকনমিক্স যেন একা একটি ছোট গ্রাম। শিক্ষকের সাথে দেখা করার পর লাঞ্চ সেরে শহর দেখার জন্য আমরা দু তলা একটি
বাসে উঠে বসি। পুরো দুই দিন আমরা এডিনবরাকে ঘুরে ঘুরে দেখেছি। শপিং সেন্টার, সাগর, নদী, পাহাড়-পর্বত, পার্ক,গার্ডেন এবং মিউজিয়াম সহ অনেক অনেক কিছু। আর তার সব কিছুই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের কৃতি সন্তান, ইউরোপে বাঙালি সমাজের গর্ব, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও দানবীর ড. ওয়ালী তছর উদ্দীন সাহেবের কারণে। তিনি নিজের কারে (car) করে আমাদেরকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে পরম স্নেহ ও সম্মানের সাথে আপ্যায়ন করে স্কটল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁর মহানুভবতা কখনও ভুলে যাবার মত নয়। আমার ছেলেমেয়েদেরকে তিনি যে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন তা কল্পনাতীত। তিনি আজ আমার কাছে পরম পূণ্য এক স্মৃতিময় অধ্যায়।
এডিনবরা স্কটল্যান্ডের রাজধানী। সুন্দর পরিপাটি শহর। ঐতিহ্য ও সবুজ সভ্যতার পাদদেশ এই দেশটি বুকে ধারণ করেছে অনেক অনেক জগতখ্যাত জনমন্ডলি।
রাণীর পূর্ব পুরুষ এই স্কটল্যান্ডের আদিবাসী। বারে বারে গ্রেট ব্রিটেন শাসন করেছেন স্কটরা। তাদের সব আছে, শুধু স্বাধীনতা নেই।
আলাদা পার্লামেন্ট,পতাকা, নিজস্ব টাকা, মন্ত্রী, এমপি ও সংবিধান সবাই আছে, আছে নিজস্ব ভাষা। তাদের ইংরেজিতে কথা বলার ধরণও আলাদা। স্কটস ও স্কটস গ্যালিক তাদের আঞ্চলিক ভাষা।
স্কটল্যান্ড (ইংরেজি ভাষায় Scotland. যুক্তরাজ্যের একটি অংশ, গ্রেট ব্রিটেনের উত্তর তৃতীয়াংশে অবস্থিত। এটি দক্ষিণে ইংল্যান্ডের সঙ্গে একটি সীমানা ভাগ করে এবং দক্ষিণ পশ্চিমে পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরদ্বারা বেষ্টিত।
এডিনবরা, দেশের রাজধানী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ১৮ শতকে স্কটিশ নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যা স্কটল্যান্ডকে ইউরোপে বাণিজ্যিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্প শক্তিকেন্দ্রগুলোর একটিতে রূপান্তরিত করে। গ্লাসগো স্কটল্যান্ডের বৃহত্তম শহর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বৃহত্তম তেল মজুদ রয়েছে এই স্কটল্যান্ডে । অ্যাবরদিনকে, স্কটল্যান্ড তৃতীয় বৃহত্তম শহর ও ইউরোপের “তেল রাজধানী”বলা হয়।
১৬০৩ সালে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের রাজবংশ রাজা প্রথম জ্যাকবের অধীনে একত্রিত হলেও আজ পর্যন্ত স্কটল্যান্ড নিজস্ব বিচারব্যবস্থা, নিজস্ব গির্জা, নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা, এমনকি নিজস্ব টাকা ধরে রেখেছে। ১৯৯৯ সাল থেকে স্কটল্যান্ডের নিজস্ব আইনসভা রয়েছে এবং তখন থেকে দেশটি স্বায়ত্বশাসিত।
স্কটল্যান্ডের উত্তরে আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্বে উত্তর সাগর, দক্ষিণ-পূর্বে ইংল্যান্ড, দক্ষিণে সলওয়ে ফার্থ ও আইরিশ সাগর এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর ও নর্থ চ্যানেল, যা আয়ারল্যান্ড ও গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত। ভূ-রাজনৈতিক একতার ভিত্তিতে প্রায় ১৮৬টি দ্বীপ স্কটল্যান্ডের শাসনাধীন, যাদেরকে মোটামুটি তিনটি দলে ভাগ করা যায়। একটি হল স্কটল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত হেব্রাইডস দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর সাগরে অবস্থিত অর্ক্নি দ্বীপপুঞ্জ এবং অর্ক্নি দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। বাকী দ্বীপগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম আরান দ্বীপ; এটি স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে ক্লাইড ফার্থ বা ক্লাইড উপসাগরে অবস্থিত। দ্বীপগুলিকে গণনায় ধরে স্কটল্যান্ডের মোট আয়তন 78.387 কিলোমিটার। অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলির আয়তন প্রায় ১,৫০০ বর্গকিলোমিটার।
জনসংখ্যা 5,327,700 এবং দেশটির আনুমানিক জিডিপি $235 বিলিয়ন।
জাতিগোষ্ঠী যথাক্রমে -96% শ্বেতাঙ্গ, 2.7% দক্ষিণ এশীয় এবং হাতে গোনা আরব ও কৃষ্ণাঙ্গের সহ বসবাসে দেশটি সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বর্গবাস।
দেশটির রাস্ট্রীয় নীতিবাক্য, “In my Defens God Me Defend”.
“আমার রক্ষার স্রষ্টা, আমাকে রক্ষা কর”।





Discussion about this post