“শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,
কত বালুচরে কত আঁখি- ধারা ঝরায়ে গো,
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাটি নিন্মোক্ত হাদিস ও জাকাতের বিধানে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদ হবে সবার জন্য, সুযোগ সুবিধা হবে সবার সমান সমান। একজনের সুবিধায় গরীবের অধিকার আছে। কবি অন্যত্র বলেছেন, “তৃষ্ণাতুরের হিচ্ছা আছে ঐ পিয়ালাতে”।
কাজী নজরুল “শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,,,,,,,,” বলে বিশ্বব্যাপী গরীব-দুখির কথা বলেছেন। তাদের কষ্টের কথা বলেছেন। গরীবের জীবন যাত্রার উন্নয়নে উপেক্ষার কথা বলেছেন।
নিন্মোক্ত হাদিসে একই কথা যেন বিধৃত হয়েছে-
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “জাকাতুল ফিতরাকে ফরজ করেছেন, রোজাদারকে বেহুদা নির্লজ্জ কথাবার্তা ও অবাঞ্ছনীয় কাজকর্মের মলিনতা হতে মুক্ত করার এবং গরিব মিসকিনরা যাতে একটু ভালো খেতে পারে সেই উদ্দেশ্যে।
যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে জাকাতুল ফিতরা আদায় করবে আল্লাহর নিকট তা ওয়াজিব জাকাত বা সদকা আদায় হিসেবে গৃহীত হবে। আর যে ঈদের নামাজের পর আদায় করবে তা সাধারণ দান রূপে গণ্য হবে”। আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ’র এ হাদিসের শেষাংশের প্রতি লক্ষ্য করলে আমরা দেখব যে, জাকাত ফিতরা দিতেই হবে, তাও আবার নামাযের আগে। অর্থাৎ গরীবেরা যেন এর থেকে উপকৃত হয়।
যে সব আনুষ্ঠানিক উৎসব মুসলমানদের সংঘবদ্ধ করে ‘ঈদ’ তার অন্যতম। এ জন্য বিশ্বনবী নারী পুরুষ, ছেলেমেয়ে সকলকে ঈদগাহে যেতে উৎসাহিত করেছেন।
‘ঈদ’ আরবি শব্দ। যা আওদ্ থেকে এসেছে। শাব্দিক অর্থ ঘুরে ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। প্রচলিত অর্থে ‘ঈদ’ মানে আনন্দ বা খুশি। যেহেতু এ আনন্দ প্রতি বছর ঘুরে ফিরে আসে এজন্য ঈদকে ‘ঈদ’ বলা হয়।
ইসলাম চায়, ঈদ প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসুক,
জীর্ণ কুটির সুখের অমিয়ধারায় ভাসুক,
একে অপরকে ভালবাসুক, উজ্জ্বল হোক গরীব দুখির মুখ,
ঘুচে যাক মুছে যাক ক্ষুধা রোগ শোক।
ইসলামে স্বীকৃত সকল অনুষ্ঠানের অর্থ থাকে। থাকে সুদূরপ্রসারী শিক্ষার পাঠশালাও।
ঈদুল ফিতরে যেমন আছে আনন্দ ও ইবাদত, তেমনি আছে ঐক্যের মহান শিক্ষা। আমরা আগে বলেছি, ধনীদের প্রতি গরিবের হকের কথা-“নামাজের আগে জাকাত দাও”। আমরা যেন মনে রাখি, জাকাত ধনীদের দয়া নয়, জাকাত গরীবের অধিকার। কাজী নজরুল জাকাত দিতে যারা অস্বীকার করে তাদের ডাকাত বলেছেন।
“ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই
সুখ-দুখ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই
ঈদ্-অল্-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান
ওগো সঞ্চয়ী উদ্বৃত্ত যা করিবে দান
ঈদের দিনে গোসল করে, নতুন পোশাক পরিধান করে, আতর সুর্মা ব্যবহার করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হওয়া যায় বটে কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা অন্যত্র। ইসলাম সমাজের ধর্ম, মানুষের ধর্ম। সুখ-দুখ ভাগ করে নেবার ধর্ম। সবার প্রতি সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত প্রসাসিত করার জীবন বিধানের নাম এই ইসলাম।
মিশকাত শরীফের উর্দু তরজমা ও ব্যাখ্যা সম্বলিত ‘ মোজাহেরে হক’ গ্রন্থে একটি আরবি কবিতা আছে। কবিতাটি গত জুমুআর দিনে আমার বক্তব্যের একমাত্র বিষয় ছিল। সম্মানিত পাঠকের জন্য কবিতাটির সরলানুবাদ এখানে দেয়া হল:
১. লাইছাল ঈদু লিমান লাবিছাল জাদীদ,
ইন্নামাল ঈদু লিমান আমিনা মিনাল ওয়ীদ।
২. লাইছাল ঈদু লিমান তাবাখ্খরা বিল্উদ,
ইন্নামাল ঈদু লিত্-তায়িবিল্লাজি লাইয়াউদ।
৩. লাইছাল ঈদু লিমান তাজাইয়ানা বিজিনাতিদ্ দুন্ইয়া,
ইন্নামাল্ ঈদু লিমান তাজাও ওয়াদা বিজাদিত্ তাকওয়া।
৪. লাইছাল ঈদু লিমান রাকিবাল মাত্বায়া,
ইন্নামাল্ ঈদু লিমান তারাকাল খাত্বায়া।
৫. লাইছাল ঈদু লিমান বাছাতাল বিছাত্
ইন্নামাল ঈদু লিমান জাওয়াজাস্ সিরাত।
১. যে ব্যক্তি নতুন পোশাক পরিধান করেছে তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সে ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহর শাস্তি হতে নিরাপদ থাকে।
২. যে ব্যক্তি ঈদের সাথে সুগন্ধি ব্যবহার করে তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সেই তাওবাকারির জন্য, যে পুনরায় পাপাচারে লিপ্ত না হয়।
৩. দুনিয়ার সাজ-সজ্জায় যে ব্যক্তি সজ্জিত হয় ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য নয়, ঈদ তার জন্য, যে আখিরাতের সম্বল-তাকওয়া সঞ্চয় করেছে।
৪. সোয়ারীদের উপর আরোহনকারীর জন্য ঈদ নয়, ঈদ তার জন্য, যে পাপাচার ত্যাগ করেছে।
৫. যার জন্য বিছানা/কার্পেট পাতানো হয়েছে, ( ধনী, রাজা-বাদশাহ) তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য, যে পুলসিরাতে (কবর, হাশর, মিজান) পার পেয়েছে।
আসুন, ঈদের মর্মার্থ, সুমহান বাণী উপলব্ধি করি। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করি।
Discussion about this post