অধ্যাপক কালাচাঁদ মৃত্যু :
কেউ মানুক আর না মানুক: মানুষ বলতেই সৃষ্টিশীলতায় সমৃদ্ধ এক চিন্তাশীল, ভাবনাপ্রবণ, কল্পনাবিলাসী সাহিত্যিক সত্তা; অফুরন্ত সুপ্ত প্রতিভার আকর- হোক সে সাক্ষর কিংবা নিরক্ষর। আমার একান্ত বিশ্বাস- সামান্য হলেও সৃষ্টিশীল চিন্তা প্রতিটি সুস্থ মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য; যা কোনো বিশেষ শ্রেণি, পেশা কিংবা বিদ্যাচর্চাকারীর একচেটিয়া অধিকারের ক্ষেত্র নয়- সবার জন্যই উন্মুক্ত। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই উন্মুক্তভাবে চিন্তা করে, নিজের মতো করে অনুভব করে, ভাবে; আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়ে মানবজীবনকে অধ্যয়ন করে- একই সাথে কল্পনার বিস্তীর্ণ আকাশে বিচরণও করে। নিজের চিন্তা ও কল্পনা-বলয়ের মধ্যে অবিরাম ঘুরপাক খায়- চোখ বন্ধ করে কল্পনার বিমানে ভর করে অতিক্রম করে মহাবিশ্ব, এমনকি অন্যের চিন্তার সঙ্গে নিজের চিন্তার মেলবন্ধনও ঘটায় অনায়াসে। এসবই মূলত সার্থক সাহিত্য সৃষ্টির মৌল উপাদান।
কিন্তু এই অন্তর্লীন চিন্তাজগতের সব ভাবনা, সবার ভাবনা কখনো সমানভাবে প্রকাশের আওতায় আসে না। এতকাল ধরে যদি সবার মনের সব কথা ভাষায় প্রকাশ পেত, তবে মানবসভ্যতার সাহিত্যভাণ্ডার হতো বহুগুণ সমৃদ্ধ, বিশ্বসাহিত্য হতো আরও বিস্তৃত, অতলস্পর্শী। জানি, এ ধরনের চিন্তার বিপরীতে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন- লেখকশ্রেণির মানুষ তাঁদের চিন্তাকে সহজে ভাষা ও শৈল্পিক কাঠামোয় প্রকাশ করতে পারলেও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ উপযুক্ত মাধ্যম, ভাষাগত দক্ষতা, প্রচলিত শিক্ষা কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে নিজেদের চিন্তা-ভাবনা ও চেতনাকে সাহিত্যিক রূপ দিতে সক্ষম হন না। গভীর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় এই সাধারণ শ্রেণির মানুষ তাদের ভাবনার জগৎকে কাগজে-কলমে জনসম্মুখে তুলে ধরতে হন ব্যর্থ।
অথচ আমি মনে করি, পৃথিবীর এমন কেউ নেই- যে কখনো একজন সাহিত্যিকের মতো, কবির মতো সামান্য হলেও চিন্তা করতে পারে না বা করে না; ভাবতে পারে না বা ভাবে না। আসলে এটাই দারুণ সত্যি- প্রতিটি সুস্থ মানুষের ভেতরেই নিহিত থাকে সম্ভাব্য প্রতিভাশক্তি ও সৃষ্টিশীলতার বীজ: যা মাত্র একটি অনুকূল পরিবেশ, সুষ্ঠু পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রকাশের সুযোগ পেলে স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যিক ভাষ্যে রূপান্তরিত হতে পারে বলে বিশ্বাস করি।
অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা- ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, শৈল্পিক অনুশীলনের অভাব কিংবা সামাজিক অনীহার কারণে সাধারণের ভাবনার জগৎ অব্যক্তই থেকে যায়। সেইসাথে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চিরতরে হয়ে যায় বিলীন-বিনষ্ট-নিশ্চিহ্ন। গণ-মানুষের মৃত্যুতে হারিয়ে যাওয়া সেই অমূল্য ভাবনাসোপানগুলো এভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার বেদনা আমাকে অনেক বছর ধরে প্রতিনিয়ত আহত করত, ভাবিয়ে তুলত। যদিও জানা কথা, এই সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রচলিত পদ্ধতিতে এককভাবে সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রবেশ করানো অসম্ভব, সাধ্যাতীত।
তারপরেও হাল না ছেড়ে, আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা অব্যাহত: হৃদয়ে জাগ্রত একটি গণস্বপ্ন- তা হলো, এই বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে সাহিত্যে পরিণত করার একটি কার্যকর কৌশল উদ্ভাবন করা। ভাবতাম, সত্যি-সত্যিই যদি কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল-অবলম্বনে জন-সাধারণের ভাবনাকে সাহিত্যের আলোকে প্রকাশ-মাধ্যমে নিয়ে আসতে পারি, তবে সাহিত্যজগৎ নিত্যনতুন সৃষ্টিকর্মে হয়ে উঠবে আলোকিত, ঝলমলে।
এই মর্মে, কাঙ্ক্ষিত সেই সুনির্দিষ্ট পথের অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে প্রশ্ন জাগে:
১. এমন কোনো সুনির্দিষ্ট পথ কি নেই, যার মাধ্যমে লেখক নন এমন চিন্তাশীল গণ-মানুষের ভাবনাও সাহিত্যরূপে সংরক্ষিত হতে পারে?
২. সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে আসলেই কি একটি পূর্ণাঙ্গ ও শিল্পসম্মত সাহিত্য নির্মাণ করা সম্ভব নয়?
উক্ত প্রশ্নদ্বয়ের হ্যাঁ-সূচক উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়েই ধীরে ধীরে দ্বিতীয় প্রশ্ন থেকে মনের ক্যানভাসে একটি নতুন ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে এবং যা দৃঢ়তার সাথে উপলব্ধি করি- সবার দ্বারা এককভাবে সাহিত্যচর্চা করা সম্ভব নয়; কিন্তু যদি যৌথভাবে দুই বা তার অধিক মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তাকে পরিকল্পিতভাবে সংযুক্ত ও বিন্যস্ত করা যায় তবে সেই অংশীবাদী যৌথ সাহিত্য একক লেখকের রচিত সাহিত্য অপেক্ষা শক্তিশালী সাহিত্যে পরিণত হতে পারে- এ সম্ভাবনা কিছুতেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এতদিন যদিও সকলে সাহিত্যকে একক ব্যক্তির একক-সৃষ্টিকর্ম রূপেই দেখে দেখে অভ্যস্ত- সেহেতু হঠাৎ করে সমষ্টিগত অংশীবাদী সাহিত্যচর্চার পদ্ধতির চিন্তাকে অনেকে হাস্যকর বলে উড়িয়েই দিতে চাইবেন- এও জানি। আবার বুঝে ওঠার পূর্বেই কিছু লেখকের পক্ষ থেকে আসতে পারে বাধা-বিপত্তিও। এর কারণ- কেবল বাংলায় নয়- বিশ্বসাহিত্যেও অংশীদারিত্বমূলক বহুত্ববাদী সাহিত্যচর্চার ধারণা এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত। এখানেই উক্ত পদ্ধতির প্রয়োগের পূর্বে সেই পুরাতন প্রশ্ন নতুন আলোকে অন্তরে আবারও ধাক্কা দেয়-
সাহিত্য কি আজন্মকাল শুধু ব্যক্তি-মালিকানার সম্পদ হয়েই থাকবে? নাকি তা সমষ্টিগত চিন্তার ফসল রূপেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে? এবার হাতে-কলমে অন্তত একবার এর প্রমাণ করেই দেখি।
এই “একবার প্রমাণ করেই দেখি” ভাবনার বাস্তব পরীক্ষণ ঘটেছিল আজ থেকে ২৫ বছর পূর্বে ২০০০ সালে; তখন বেড়াতে গিয়েছিলাম ঢাকার মানিকনগর, সিটিগলি এলাকায়। সেদিন বিকেলে একটি গান লেখায় ব্যস্ত ছিলাম। ওখানে উপস্থিত ছিলেন আরও সাত-আটজন- তারা কেউ সমবয়সী, কেউ যুবক, কেউ বৃদ্ধ। একজনে আচমকা বলে বসলো, আমরাও কিছু লিখতে চাই- কিন্তু পারি না- কী করা যায় কবি?
দীর্ঘদিন পুষে রাখা অংশীবাদী সাহিত্যের ধারণাটি চট করে কাজে লাগানোর সময় সন্নিকটে হাজির। বললাম, চিন্তা কী? আমরা সবাই মিলে একটিমাত্র লেখা লিখব। প্রত্যেকেই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, কেউ কেউ মৃদু হাসলো: এরপর একযোগে বলে উঠল-
“সবাই একসাথে, মানে?” আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বললাম-
কেন নয়? সবাই বসুন, এখনই সবার ভাবনাকে একত্র করার কায়দাটা দেখাচ্ছি; আচ্ছা, সবাই মিলে একটি নাটক লিখলে কেমন হয়?
চোখ-মুখের ভাব দেখে মনে হলো, কথাটি কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিছুটা বিস্মিত-ভাব নিয়েও আগ্রহ সহকারে সবাই গোল হয়ে বসে পড়লো আমার পাশ ঘেঁষে। সবার মুখে আমার ভাবনার প্রতি একরকম তাচ্ছিল্যের হাসিটা তখনো ছিল। হাসিটা উপেক্ষা করে সেই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সকলের চিন্তাকে সমন্বয় করার স্বপ্নে শুরু করলাম একটি অনির্ধারিত, অজানা বিষয় নিয়ে আন্দাজে নাটক রচনার সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ।
শুরুতে একটি চরিত্র নির্ধারণ করে প্রথম সংলাপের দুটি শব্দ লিখে পাশেরজনকে বললাম, পরের দু-তিনটি শব্দ লিখতে। সে আমার প্রদত্ত শব্দদুটি বারবার পাঠ করে তার সাথে নিজের চিন্তা মিশিয়ে কয়েকটি শব্দ লিখে পাশের জনকে দিয়ে দিলো পরের অংশ লিখতে। খেয়াল করলাম, আমার দেওয়া দুটি শব্দের পরে আমি নিজে যা লেখার কথা ভেবেছিলাম, পরের জন তার ধারকাছ দিয়েও না গিয়ে এমন কিছু লিখলো- যা রীতিমত চমকে দেওয়ার মতই ছিল। এভাবে সবাই মিলে চমকাতে চমকাতে কেউ লিখলাম প্রতি সংলাপের দু-তিনটি শব্দ, কেউ সংলাপে যুক্ত করলাম নতুন চিন্তা, কেউ উক্ত চিন্তার সাথে নিজের চিন্তাকে যুক্ত করে সংলাপটি সম্পূর্ণ করলাম। কেউ নতুন চরিত্র সংযোজন করলাম, কেউ চরিত্রানুসারে ভাব-গম্ভীর সংলাপ নির্মাণ করলাম। কেউ সংলাপের প্রতিপক্ষ হয়ে তীব্র উত্তর দিলাম। কেউ ঘটনাকে সম্পূর্ণ নতুন মোড়ে নিয়ে চললাম। এভাবেই হাত বদল হতে হতে সমবায়ী চিন্তার ভেতর প্রত্যেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে দৃশ্যের পর দৃশ্য নির্মিত হতে থাকল। ততোক্ষণে আমার বলা সেই “সবাই মিলে” কথাটির প্রতি সকলের তাচ্ছিল্যের ভাবটাও কেটে গেছে- সেই সাথে সবার চোখে তাকাতেই যেন একটা নাট্যকার নাট্যকার ঝিলিকও উপলব্ধি করলাম!
ফলাফলস্বরূপ, এক আশ্চর্য, অনন্য ও ব্যতিক্রমী সৃষ্টিকর্ম দৃষ্টিসম্মুখে অবতরণ করল। সেই মুহূর্তে আমি নাটকটির ভাষার সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে সকলের সমষ্টিচিন্তার স্ফূরণ-স্পর্ধাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম এবং ধারণা করলাম সারা পৃথিবীর যে কোন একজন লেখকের পক্ষে সারাজীবনেও এমন বহুমাত্রিক ও প্রাণবন্ত একখানা নাটক রচনা আদৌ সম্ভব নয়। এই বহুত্ববাদী, সমবায়ী ও অংশীদারিত্বমূলক সাহিত্যসৃষ্টির পদ্ধতিকেই সেদিন ‘গণসাহিত্য’ নামে অভিহিত করেছিলাম- যা গণ-মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তার সম্মিলনে প্রস্ফুটিত সাহিত্যসৃষ্টির এক কার্যকর মাধ্যম। আর এর বিস্ময়কর সম্ভাবনা এই- সাহিত্যের যে কোনো শাখাতেই ইচ্ছা করলে গণসাহিত্যের চর্চা করা সম্ভব।
বহু বছর পর, ২০২৫ সালে এসে কবি বিকাশ চক্রবর্তীর ডাক্তারি চেম্বারে বসে হঠাৎ মনে পড়লো গণসাহিত্যের অংশীবাদী কৌশলে নাটক রচনার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি। উক্ত ঘটনাটি উপস্থাপন করা মাত্রই চেম্বারে উপস্থিত কয়েকজন লোক গণসাহিত্য চর্চার প্রতি তাৎক্ষণিক উৎসাহ প্রকাশ করলেন। আমি এবারও সুযোগটি হাতছাড়া না করে সেই মুহূর্তেই সবাইকে নিয়মটি বুঝিয়ে দিয়ে চট করে কয়েকটি শব্দ লিখে সবার মাঝে ছেড়ে দিলাম। আমার দেওয়া শব্দগুচ্ছ পাঠের আলোকে একে একে প্রত্যেকের দ্বারা নিজেদের চিন্তা-নিসৃত একটি-দুটি করে শব্দ সংযোজিত হতে হতে একসময় চরম উত্তেজনা নিয়ে নিচের গদ্যিকাটি দৃশ্যিত হলো:
সে যেন আজ কত দূরে
গণ-সাহিত্যিক: বিকাশ চক্রবর্তী, মধুচন্দ্র নারায়ণ, দেলোয়ার হোসেন মোল্লা, বিজন রত্ন, কালাচাঁদ মৃত্যু
সমুদ্রের দিকে আমি ব্যস্ত- প্লাবিত মন;
ওড়ে গাংচিল।
মাধূর্যের আঁচলে বাঁধাপড়া জীবন- এই তো প্রেম!
অনন্ত প্রেমে খুঁজি পুরাতন মুখ নতুন করে-
খুঁজেই আমি ব্যস্ত।
পাহাড়ের গায়ে সমুদ্রের ঢেউ,
উঁকিমারা সূর্য দেখে নাকি কেউ?
ভেতরের সূর্যটা জ্বলন্ত ফুলের মতো;
খুঁজি যারে পাই না তারে-
সে যেন আজ কত দূরে।
প্রত্যেকের চিন্তা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় লেখার মান, গতি ও অর্থ কী হবে, কেমন হবে- লেখাটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে অনিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু ম্যাজিকের মতো অল্প সময়ের মধ্যেই একটি গভীর অনুভবসম্পন্ন, নান্দনিক ও রোমান্টিক গদ্যিকা রচনা সম্পন্ন হলো। আমরা কিন্তু কেউই সেদিন ভাবিনি- পাঁচজনে মিলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে এমন একটি চমৎকার গদ্যিকা সংযুক্ত করতে পারব।
গত সপ্তাহে, কোটালিপাড়ায় কবি মিন্টু হক সম্পাদিত কাশবন সাহিত্য পত্রিকার ২৭ তম আড্ডা শেষে উপস্থিত লেখকগণের দ্বারা গণসাহিত্যের সূত্রে নিম্নোক্ত গদ্যিকাটিও পুষ্পিত হয়।
অস্তিত্বের মন্ত্র
গণ-সাহিত্যিক: সৌরভ শেখ, সুমন দাশগুপ্ত, নাদিম শিকদার, জাহাঙ্গীর হোসেন খান, মো. সেলিম মণ্ডল, কালাচাঁদ মৃত্যু
জীবনের মন্ত্র এক দৃষ্টিতে দেয় না ধরা;
অনিশ্চয়তার মহাসড়কে তার নিরন্তর ছুটে চলা আজীবন—
পথিকের চোখে অস্তিত্বের অদৃশ্য নোঙর:
নগরের খোঁজে সময় অস্থির, দৃঢ়-মুষ্টিবদ্ধ;
চলুক সমতালে বৈতালিক সময়ের দাপুটে শাসন;
কাঁপুক অন্যায়ের আসন,
হানুক অগ্নিঘা
হোক নাশ অধর্মের
হোক অনিবার্য পতন অসভ্যতার—
পৃথিবীকে অন্য মোড়ে গড়িয়ে নিতে পথিকই গড়ুক গতিশীল আশ্চর্য!
তারপর, মনুষ্যত্বের তীর-ধনুকের মহাঝঙ্কারে
নড়ে উঠুক মহাবিশ্ব;
অহঙ্কার-শিখরে উড্ডীন হোক কৈবর্তের মানবতা
জ্বালুক নতুন সূর্য।
এমন উদাহরণ-সৃষ্টির অভিজ্ঞতাই গণসাহিত্যের মহাশক্তির প্রত্যক্ষ প্রমাণ; এটি এখন আর নিছক কল্পনাপ্রসূত ধারণায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি কার্যকর ও পরীক্ষিত সাহিত্যচর্চা-পদ্ধতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। এ পদ্ধতিতে পৃথিবীর যে কোনো স্তরের মানুষ সাহিত্যসৃষ্টির অংশীদার হতে পারে। এখানে লেখক হওয়ার কোনো পূর্বশর্ত নেই; চিন্তাশীল হওয়াটাই যথেষ্ট।
এখন নিঃসন্দেহে বলা যায়- গণসাহিত্য সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে উন্মোচিত হওয়া এক নতুন দিগন্ত; যা ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে সমষ্টির চেতনা-নির্ভর সাহিত্যচর্চার এক অভিনব অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রায় অবহেলিত গণমানুষের নীরব ও অবচেতন চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে মানবসভ্যতার জন্য উন্মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি এক সর্ববৃহৎ সাহিত্যভাণ্ডার নির্মাণের পথ। এই পথে গণমানুষের ভাবনাকে সংরক্ষণ ও সংবর্ধনের মাধ্যমে মানবচেতনা নির্মাণই একমাত্র লক্ষ্য ও সাধনা। সেই সাধনা-নির্মিত গণসাহিত্য কেবল সাহিত্যই নয়- এটি গণমানুষের সম্মিলিত চিন্তার এক স্থায়ী দলিলও বটে।
গণসাহিত্যের এই অভিনব সূত্রকে হৃদয়ে ধারণ করে সাধারণ মানুষকে নিয়ে সম্মিলিত সাহিত্যিক সংঘ গঠনপূর্বক গণমানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবনাকে একত্রিত করার নির্ভরতায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বব্যাপী বৃহৎ ও অমর গণসাহিত্য নির্মিত হওয়া এখন কেবল সময়ের দাবি।







Discussion about this post