মোঃ কামরুল ইসলামঃ
বন্ধুত্ব আপনার আমার আত্মার একটি শক্তিশালী বন্ধন।অনেকে বলে,সমাজবিদ্যা,সামাজিক মনো- বিজ্ঞান,নৃতত্ত্ব এবং দর্শনে বন্ধুত্বের শিক্ষা দেয়া হয় তা সত্যি কিনা আমি জানি না তবে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ডেটাবেজ গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে মানুষ সুখী হয়। সৎ, ন্যায়পরায়ন,মানব প্রেমী মানুষ সব সময় সুখী হয়,আমি ও সুখী,আমার বন্ধু সুখী।উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে বন্ধুবর মোঃ নুরুল ইসলামের কথা।সে একজন আই ভিশন বিশেষজ্ঞ ও জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতালের স্বত্তাধিকারী। তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব সেই ১৯৮৪ সাল থেকে। আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে যে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি সেও একই বিদ্যালয়ে একই শ্রেনীতে সেই থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আমি বরাবরই প্রতি শ্রেণীতে প্রথম হলে ও সেই ছিল নেতা ( ক্লাস ক্যাপ্টেন) তবে আমাদের মনে রাখতে হবে,স্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য সব সময় মায়া, মমতা, স্নেহ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সততা, স্বার্থত্যাগ, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সমবেদনা, একে অপরের সঙ্গ, আস্থা, সুখ দুঃখ বিনিময়,ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে দেখা সাক্ষাৎ, পারিবারিক,শারীরিক, সমাজিক বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময়,অনুভূতি প্রকাশ সহ সব কিছুর মিল বন্ধন থাকতেই হবে। সেই দিক থেকে আমরা এখনও প্রবাহমান।অনেকের মতে, বাধভাঙ্গা সম্পর্কের মিলনকেন্দ্র হচ্ছে বন্ধু। যে কথা কাউকে বলা যায় না,সে কথাই অকপটে বন্ধুকে বলা যায়।মনের বাঁধ ভাঙা আবেগ,ভালবাসার অপর নাম বন্ধুত্ব। জীবন চলার পথে বন্ধুত্বের সম্পর্কে থাকে না জাতিভেদ,যে সম্পর্ক থাকে সবসময় সব বাঁধনের উর্ধ্বে।জীবন চলার পথে কত বন্ধু,কত মানুষের সাথে পরিচয় হয়।এক সময় ধীরে ধীরে সবাই দুরে চলে যায়।এটি বাস্তবতা।অনেক সময় দেখেও অনেক বন্ধু না দেখার ভাণ করে।মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গড়ে উঠা বন্ধুত্ব যদি সযতনে লালন করা যায়,সহমর্মিতা, সততা বজায় রেখে একজন আরেকজনের কল্যানে,সুখে দুঃখে এক হওয়া যায় তখন সেটি হয় প্রকৃত বন্ধুত্ব।আবার ভালো সম্পর্ক কখনও প্রকৃত বন্ধুত্ব হতে পারে না। প্রকৃত বন্ধুত্বের জন্য প্রত্যেকের কিছু কিছু ব্যক্তিগত গুণ থাকতে হয়। যেমন-দুঃসময়ে একে অপরের পাশে থাকা।বন্ধুর বিপদে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই তার পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়। সব সময় বন্ধুর বিপদে সাহায্য করা। যে বন্ধু কোনো স্বার্থ ছাড়াই বিপদের দিনে সাহস জোগায়,অন্তর থেকে দোয়া করে, সেই মানুষটি অবশ্যই প্রকৃত বন্ধুদের মধ্যে একজন।আমরা জানি,বিশ্বাস ভালোবাসার শক্তি। আর বন্ধুত্বে বিশ্বাস রক্ষা করা খুবই জরুরি।তৃতীয় কোনো পক্ষের কথার সূত্র ধরে বন্ধুত্বের বিশ্বাসভঙ্গ কখনোই কাম্য হতে পারে না।প্রকৃত বন্ধু কখনও বন্ধুর দোষ আরেক জনকে বলতে পারে না বললে সে কখনও কোনদিন প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। প্রকৃত বন্ধু,প্রকৃত বন্ধুর ইচ্ছাকে সব সময় সম্মান জানাবে যা স্বাভাবিক।কোন কিছু পছন্দ না হলে প্রকৃত বন্ধু প্রকৃত বন্ধুকে তা সরাসরি বলবে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।সমালোচনা করা যাবে, তবে তা যেন কটুক্তি না হয়। তবে সমালোচনার ভাষা ব্যবহারে প্রকৃত বন্ধুকে সচেতন হতে হবে।কখনও কোন ভুল হলে প্রকৃত বন্ধু,বন্ধুকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে না,শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করবে কেননা বন্ধুর প্রতি বিনয়ী হওয়াই বন্ধুত্বের প্রধান হাতিয়ার।শুধু প্রকৃত বন্ধু নয় সব মানুষকে সব সময় বিনয়ী হতে হবে।সেই ক্ষেত্রে বন্ধুবর মোঃ নুরুল ইসলাম বিনয়ী,ভদ্র,মানবিক তা আমি অস্বীকার করতে পারবো না,কেউ করবে না।প্রিয় বন্ধু হতে হবে চিরদিনের। যদিও আমরা দুজন স্কুল,কলেজে এক সাথে ছিলাম। এর পরও যদি বলি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার কত বন্ধু ছিল আজ বাস্তব জীবনে দুই একজন ছাড়া বাকিরা দেখা হলে মনে হয় তাদের কথা বলার ও সময় নেই তা কখনও প্রকৃত বন্ধুত্ব হতে পারে না। বাস্তব জীবনে,কর্মব্যস্ত শহরে অনেক ঘটনা ঘটে,ঘটনা অঘটনার পর ও প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনোই হারিয়ে যায় না। দুজন ভালো বন্ধু কখনোই একে অপরকে ভুলে যাবে না, বরং আরও বেশি করে একে অপরকে মনে করবে এবং সময় পেলেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করে খুনসুটি করবে,এমনই হতে হবে প্রকৃত বন্ধুত্ব।আমি আর মোঃ নুরুল ইসলাম হয়ত তাই। মনে রাখতে হবে রাগ অভিমান করে পরস্পরকে ভুলে যাওয়া কখনোই প্রকৃত বন্ধুত্ব নয়। দেখা হলে সে স্কুল জীবনে কে কি করেছে আমাকে কে কয়টি পত্র দিয়েছে,আমি কেমন ছিলাম তার বর্ননা সত্যি আমাকে হয়ত মুগ্ধ করে।দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় প্রেরক লিখেছিল আমায় যেমন – যাও পাখি উড়িয়া,পত্রখানি নিয়া…কথাটি মনে পড়লে আজ ও হাসি পায়। হাসিমুখে কথা বলতে বলতে দুপুর গড়িয়ে যদি সন্ধ্যে নেমে আসে নিজের অজান্তে তাহলে সেটি প্রকৃত বন্ধুত্ব। যেখানে থাকে না কোন স্বার্থ,থাকে না কোন ব্যস্ততা।
আমাদের বন্ধুত্ব সাবলীল এবং স্বতঃস্ফুর্ত। ফলে আমি আর সে একসাথে হলে কখনই একসঙ্গে চুপচাপ থাকি না আমরা ক্ষণিকে প্রাণবন্ত এবং উচ্ছ্বল হয়ে উঠি।
আমি যতবারই প্রয়োজনে তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে যাই,আমাকে দেখা মাত্র তার কর্মব্যস্ত সময়ে সব কিছুতে সে বিরতি আনে,আমার প্রতি তাঁর সম্মানবোধ আমাকে মুগ্ধ করে।আমাকে দেখিয়ে অন্যের নিকট যখন আমার ভুয়সী প্রশংসা করে তখন আমি নিজকে লজ্জার চাদরে মুখ লুকিয়ে রাখি তখন সে অনর্গল হাসতে থাকে আর আমাকে নিয়ে সে স্মৃতি চারণ করে,খোশ গল্পে মেতে উঠে এটি হয়ত প্রকৃত বন্ধুত্ব।
সে আমাকে ও আমার পরিবারের সকলকে সকলের নেত্র ও এর বিভিন্ন স্বাস্হ্য সমস্যা জনিত বিষয়ে উপদেশ সহ সযতনে দেখবাল করে।এটি প্রকৃত বন্ধুত্ব।ভালো বন্ধু সবসময় বন্ধুর ভালো চায়। নিজের ভালো হোক এটি পৃথিবীতে সকলেই চায় এটি প্রকৃতির নিয়ম। অন্যদিকে প্রকৃত বন্ধুর ক্ষতি হোক প্রকৃত বন্ধু তা কখন ও ভাবে না,ভাবতে পারে না আবার ভাবা কিন্তু প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় নয়। প্রকৃত বন্ধু সব সময় চায় তার নিজের উন্নতির পাশাপাশি তার বন্ধুর উন্নতি হোক এবং এইক্ষেত্রে সাধ্যমত সে চেষ্টা ও করে।
বন্ধুত্বে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।মনের মতো বন্ধু হতে হলে সততার কোনো জুড়ি নেই।
বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় বা কথা বলায় খেয়াল রাখতে হবে যেন সব সময় নিজের কথাগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া না হয়। বন্ধুকেও কথা বলতে দেওয়া এবং আলোচনায় উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে দুজনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা যেন পরস্পরের বুঝে নিতে সুবিধা হয় তা খেয়াল রাখতে হবে।প্রকৃত বন্ধু বন্ধুকে অন্তর থেকে ভালবাসবে বন্ধুর সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া,বন্ধুর কাছে গুরুত্ব পূর্ণ এমন বিষয় নিয়ে উপহাস না করাই মুলত প্রকৃত বন্ধুত্ব।
বন্ধু মানেই কেবল নিজের সবটুকু কথা বলা নয়, বরং তার বন্ধুর কথাগুলোকেও আপন করে নেওয়া। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন কাজ।তবে একজন প্রকৃত বন্ধু সব সময়ই তার স্বাভাবিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়।
আমরা জানি,বন্ধু ও বন্ধুত্ব সম্পর্কে জর্জ হার্ভার্ট হাসি মুখে বলেছেন, ‘একজন বন্ধু হলো সর্বোৎকৃষ্ট আয়না।’ তার মানে, এই আয়নাতে প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে দেখবে। শুধু বাহ্যিক অবয়বকে নয়, ভেতরটাকেও। বন্ধুত্বটা হওয়া চাই হাত আর চোখের সম্পর্কের মতো। হাতে ব্যথা লাগলে চোখে জল আসে। আর চোখে যদি জল ঝরে, তবে হাত এগিয়ে যায় তা মুছে দিতে।কেননা বন্ধুত্বে মিশে থাকে নির্ভরতা আর বিশ্বাস। বন্ধু ও বন্ধন মুলত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। বন্ধুর জন্য গেয়ে ওঠা- হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমার- আমার অন্যদিনের ভোরে।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে,একজন ব্যক্তির জীবনের ভালো দিকটা গড়ে ওঠে তার বন্ধুত্ব দিয়ে।অনুভূতির যত রঙিন জানালা আছে তার মধ্যে বন্ধুত্বের জায়গাটি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ। বন্ধুকে পাশে রেখে চলা যায় সীমাহীন পথ।যার প্রকৃত বন্ধু নেই সে এই জীবন থেকে পালিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে এবং অনেকেই নানান পথ খোঁজে।
প্রকৃত বন্ধুটিই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবে খোলা মাঠে।
সবুজ ঘাস যেখানে থাকে সেখানে। ছন্দহীন জীবনে ছন্দ,নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতে প্রকৃত বন্ধুর জুড়ি নেই।
বন্ধুত্বে কাউকে আমন্ত্রণ জানানো অন্যায় নয় তবে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে আমাদেরকে ও প্রকৃত মানুষকে বন্ধু করলে,করতে পারলে ও তার সাহচর্যে ও অনুপ্রেরণায় আশাহত পৃথিবীতে আপনি বেঁচে থাকতে সাহস পাবেন অনেকদিন আর সেই আপনাকে দেখাবে সবুজে ঘেরা শেফালির সেই কাশবন।
লেখক- কবি,প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকারকর্মী।







Discussion about this post