প্রসঙ্গ: ‘ঈদ’ শব্দের মৌলিকত্ব
নজরুল ইসলাম হাবিবী
বাংলা একাডেমী ‘ঈদ’কে ইদ অর্থাৎ ই দিয়ে লিখতে আদেশ করেছে। এ আদেশ কেউ চাইলে মানতে পারেন। তবে, আমি ঈ দিয়ে লিখব। কারণ, আমি মনে করি, ই দিয়ে লিখলে আরবি শব্দের মৌলিকত্ব থাকবে না।
আরবি তাজবিদ মতে ‘আইন’ বর্ণটি হরফে খলক। এটি গলার প্রথমভাগ থেকে বের হতে হয়। তা না হলে সঠিক অর্থ জানা শ্রোতাদের জন্য কষ্টকর হবে। শ্রোতা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাবেন আইন আলিফ বা হামজার অর্থ খুঁজতে গিয়ে। কারণ, উচ্চারণের দিক থেকে আলিফ বা হামজার নিকটবর্তী বর্ণ আইন। আইন গলার উপরি ভাগ থেকে এবং আলিফ বা হামজার উচ্চারণ গলার শেষাংশ থেকে। আইনের উচ্চারণ একটু ভারী আর আলিফের উচ্চারণ হালকা। এই নরম গরম উচ্চারণের ফেরে অর্থে ঘটে বিপত্তি।
এখন কেউ যদি ঈদ বানান ই দিয়ে করে তখন শ্রোতা বিভ্রান্ত হবেন। শ্রোতা মনে করবেন, আইন নয় আলিফ পড়া হচ্ছে। তদুপরি, আরবি মতে, ঈদ শব্দটি আইন ইয়া এবং দাল নিয়ে গঠিত। এই মধ্যবর্ণ ইয়া তাজবিদ মতে একটু লম্বা করে পড়তে হয়। এটি হরফে মদ্দ। তিন বর্ণের এই শব্দটির প্রথম দিকের দুই বর্ণই লম্বা করে পড়তে হয় বিধায় ঈদকে ইদ করার সুযোগ নেই। এ জন্যই তো আমরা ঈ বলি। মানে দীর্ঘ ঈ। আমরা জানি, লম্বা করে পড়তে ঈ এর ব্যবহার হয়।
এ জন্যই বাংলা একাডেমীর মহা পরিচালক হাবিবুল্লা সিরাজী সাহেব স্বয়ং ‘সিরাজী’ লিখেন ঈ কার দিয়ে। উনার নামের শেষ শব্দ ‘ইয়া’। ইয়া হরফে মদ্দ। লম্বা করে পড়তে হয়। এখানে তিনি আরবি নিয়ম মেনে চলেছেন।
একই কারণে আমি ‘হাবিবী’র শেষ ব-তে ঈ কার ব্যবহার করি।
বাংলাতেও সে সমস্যা আছে।
‘করি’ মানে আমি কাজটি করি।
আর ‘করী’ মানে হাতি।
সৈয়দ আলাওল লিখেছেন:
করী পুচ্ছ ধরিলে সমুদ্র হয় পার/
ধরিলে অজার পুচ্ছে ডুবে মধ্যে ধার।
বাংলা একাডেমীতে কত কাজ, কত সমস্যা, বিজ্ঞজনেরা ঈদকে নিয়ে টানাহেছড়া না করে পারতেন।
আর যেহেতু শব্দটি একান্তই ধর্ম সংশ্লিষ্ট, নাজুক, স্পর্শ কাতর, বিশ্বব্যাপী জাতি ধর্ম, ছোট বড় নির্বিশেষে সবার জন্য ভালবাসার একটি পবিত্র পতাকা, সবার কাছে অতি পরিচিত একটি নাম এই ঈদ শব্দের বানান রীতি পরিবর্তনে আরও একটু সময় নিতে পারতেন।
যে সংস্থাটি সেদিনও ‘বাঙলা’, ‘বাঙ্গালা’ এবং ‘বাংলা’কে তিনটি টেবলেট করে আমাদেরকে চিকিৎসাপত্র (Prescription) দিয়েছে, তাদের ওষুধ আমি খেতে নারাজ। আমি ভুল টেবলেট খেয়ে অকালে সকালে অক্কা পেতে পারি না।
বাংলা একাডেমী এখনও ‘একাডেমী’ লিখে ঈ কার দিয়ে।
গ্রীক শব্দ Akademeia. এথেন্সের একটি উদ্যান। যেখানে প্লেটো শিক্ষা দান করতেন।
এর ইংরেজি রূপ Academy. এই Y বর্ণটি বাংলার ঈ বর্ণের কাজ করে। তাই সম্ভবত বাংলা একাডেমী এখনও ‘একাডেমী’ লিখে ঈ কার দিয়ে।
তা হলে বলা যেতে পারে, সম্মানিত গবেষকগণ ‘Academy’ শব্দের মৌলিকত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন। অত্যন্ত যৌক্তিক একটি ফর্মুলা। এর জন্য ধন্যবাদ জানাই।
তবে আমি বুঝি না ‘ঈদ’ শব্দের মৌলিকত্বে কেন ভুল চিকিৎসা?
ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একুশে বইমেলার মঞ্চে কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমীর মহা পরিচালক হাবিবুল্লা সিরাজী প্রধান অতিথি ছিলেন। আমিও একই মঞ্চে একই সাথে সারাদিন ছিলাম।
আরও কিছু বিষয় নিয়ে উনার সাথে কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও
ব্যস্ততার কারণে হয়ে ওঠে নি।
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী
10. 06. ’19
লন্ডন।







Discussion about this post