কাব্যানুবাদ: শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার (র)
জন্ম: প্রায় ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দ,
নিশাপুর
মৃত্যু: প্রায় ১২২০ খ্রিস্টাব্দ
নিশাপুর।
পুরো নাম, হামিদ বিন আবু বাকর ইব্রাহিম
Abū Hamīd bin Abū Bakr Ibrāhīm
ابو حمید ابن ابوبکر ابراهیم তিনি অধিক পরিচিত ফরিদ
উদ্দিন আত্তার(عطار ) (গন্ধদ্রব্যব্যবসায়ী) বলে।
অনেকেই ‘আক্তার’ বলেন, তা শুদ্ধ নয়।
শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার ছিলেন একজন ফার্সি সুফিবাদী মুসলিম কবি। সুফিবাদ এবং ফার্সি কবিতার উপর তিনি একটি স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছেন। শত শত বছর ধরে তিনি মানুষের মুখে মুখে জেগে আছেন। চিন্তাশীলগণ
অনেক কথায় আত্তারের যুক্তি ও উপমা খুঁজে পান।
তিনি ত্রিশটির মত বই লিখেছেন বলে জানা যায়। তাঁর প্রসিদ্ধ বই ‘মুনতাকে তাইয়ার’ , ‘পাখি সমাবেশ’ বা ‘পাখি কথন’ ।
ফার্সি একটি সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ ভাষা। আমাদের বাংলা সাহিত্যে হাজার হাজার ফার্সি শব্দ চুপচাপ বসে আছে এক্কেবারে পাকা বাংলার শাড়ি চুড়ি পড়ে। তাই আমি মনে করি, যারা ভাল বাংলা জানতে চান, তাদের ফার্সি ভাষায় কিছুটা হলেও ধারণা থাকা দরকার। কারণ, শব্দের গভীরে- মৌলিকত্বে যেতে না পারলে সাহিত্যের সাগরে সাঁতার কাটা হয়, ডুব দিয়ে চুপ করে চুনি রুবি সংগ্রহ করা যায় না।
না, ফার্সি মোল্লার ভাষা শুধু নয়; পাল্লার ভাষাও। যিনি অর্থনীতি পড়াবেন তাঁকে ‘আমদানি’ ‘রপ্তানি’ও যে ফার্সি শব্দ তা বুঝতে হবে, ক্লাসে বুঝাতে হবে। না হলে তিনি খাঁটি শিক্ষক হতে পারবেন না। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করবেন। দেখুন না, জমির কাগজে এখনো ‘মুন্সী’ লিখেন “ইয়াদ কিদং”! ‘গং’ ‘বনাম’ এর সাথে ‘দস্তখত’ করেন! আপনি কোথায় যাবেন? শীত ছাড়লেও কাঁথা ছাড়ে না!
ফার্সি ভাষা তেমন কঠিন নয়। পাঁচটি অতিরিক্ত বর্ণসহ আরবির সব বর্ণমালাই ফার্সিতে আছে। আপনি জানেন, ফার্সি ভাষাতে অসংখ্য উর্দু ও আরবি শব্দ আছে, অগণিত শব্দ আমাদের চির চেনা জানা। যা আমরা প্রত্যহ ব্যবহার করি, কিন্তু আমরা কখনো সে প্রেয়সীর ঘোমটা টেনে দেখি নি যৌতুকের খুৎ খুঁজে। কী লাবণ্য! কী সুন্দরী সে! তাই তো মাওলানা রুমী মাছনবীকে ‘শরীফ’ বলার সাহস করেছেন!
কথাটা ইসলামস্বীকৃত না হলেও পৃথিবীতে মাত্র তিনটি ‘শরীফ’ আছে, কুরআন শরীফ, হাদিস শরীফ ও মাছনবী শরীফ।
ছাত্র জীবনে আমি কিছু ফার্সি ভাষা শিখেছিলাম
ভার্সিটিতে পড়ার অবসরে, হাটহাজারির মেখলে গিয়ে ফার্সি শিখতাম।
জগৎ বিখ্যাত আলেম, হাটহাজারি মাদ্রাসার সাবেক প্রধান মুফতি ফয়জুল্লার (রঃ) ছেলের কাছে আমি তাজবিদ এবং ফার্সি শিখেছি বলে মনে পড়ে। পরে শুনেছি, আমার সে শিক্ষক মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় শহীদ হয়েছেন।
রাঙ্গুনীয়ার রাণীর হাটে ফেরারি জীবনে ফার্সি শিখেছিলাম ইসলামপুরের মাওলানা ইসহাক ছাহেবের নিকট।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এঁদের জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।
দেশে থাকতে দৈনিক ঈশান ও দৈনিক কর্ণফুলিতে এক সময় আমি কিছু কারিমা, বোস্তা ও গুলিস্থার কাব্যানুবাদ প্রকাশ করেছিলাম। আমি ঈশানের ‘ইকরা’ পাতার সম্পাদক ছিলাম ।
তখন কবি মরহুম আল মাহমুদ কর্ণফুলির সম্পাদক ছিলেন।
ভেবে গর্ব জাগে, বাংলাসাহিত্যের এই প্রধান কবির সাথে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছিলাম। সেখানে আমি ফররুখ আহমদ এর সাত সাগরের মাঝির উপর আলোচনা করেছিলাম। কবি আল মাহমুদ ছিলেন প্রধান অতিথি।
কর্ণফুলি ও ঈশানে প্রকাশিত আমার ফার্সি অনুবাদগুলি যদি কারো কাছে পাই চির আমি কৃতজ্ঞ হব।
দেশ থেকে লন্ডনে আসার সময় আমি অনেক অনেক বই-পুস্তক নিয়ে আসি। এ রকম একটি বই এর নাম ‘পান্দে নামা আত্তার’। বইটিতে চৌদ্দটি অধ্যায় আছে। বইটির প্রথম অধ্যায়
‘দর হামদে বারী তা’য়ালা’-অর্থাৎ, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রশংসা বর্ণনায়।
অনেকদিন থেকে ইচ্ছে ছিল খুবই সহজ সরল কথায় ফার্সির কিছু পদ অনুবাদ করি। সময়ের অভাবে এতদিন সে কঠিন কাজটি করতে পারি নি।
কিছু দিন আগে বইটি নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখলাম অাবার চাইলে তো অনুবাদ করতে পারি, তেমন কঠিনও মনে হচ্ছিল না যেন।
আমি অনুবাদে শব্দে এবং বাক্য গঠনে মারপ্যাঁচ সৃষ্টি করি নি। পড়ার সুযোগে কিছু শব্দ পাঠকের মনে তুলে ধরার একান্ত ইচ্ছে করে কতক ফার্সি শব্দ হুবহু বসিয়েছি।
আসুন, আজকের মত একটি বয়েতের সরলানুবাদ দেখে নেই:
হামদে বে-হদ মর খোদায়ে পাক রা,
আঁকে ঈমান দাদ মুশতে
খাক রা।।
কাব্যানুবাদ:
অগণন তারিফ তব স্রষ্টা রহমান
মুটি মাটি থেকে যে সৃজিলা ঈমান।
শব্দার্থ,
বেহদ بیحد- অসংখ্য, অগণিত।
দর در – মধ্যে।
মর مر – বিশেষ করে, শুধুমাত্র, একমাত্র।
রা را -জন্য।
মুশত مشت – মুষ্টি, অল্প সংখ্যক।
দাদ داد – দান করেছেন।
খাক خا ک – মাটি।
**
(চলবে ইন শা আল্লাহ)
**
নজরুল ইসলাম হাবিবী
25. 03. 19
লন্ডন।






Discussion about this post