কলম টিভি ডটকম :
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস এক অদৃশ্য শক্তির নাম। সারাবিশ্ব এই অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ একদিকে যেমন বৈশ্বিক দুর্যোগ, তেমনি প্রতিটি দেশের জাতীয় দুর্যোগ। আমাদের দেশও এই ভয়াবহ ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। মূলত চীনে গত ৩১ ডিসেম্বর এই ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্তের খবর আসে এবং আমাদের দেশে গত ৮ মার্চ থেকে এই রোগে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সারাবিশ্বের ২১৫ দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৭৬ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যুবরণ করেছে ৪ লাখেরও বেশি। তারপরও দিন যত বাড়ছে তত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনের শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। মোট রোগীর সংখ্যা ৮১ হাজারের অধিক পেরিয়ে গেছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজার ছাড়িয়েছে। চলতি জুনে সংক্রমণ বাড়ার পূর্বাভাস এপ্রিলেই অনেকবার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অবিরাম বলে চলেছেন, বাংলাদেশ এখনো করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়নি; সেটা আমাদের সামনে রয়েছে। তাঁরা বলছেন, পুরো মে মাস ও জুনের মধ্য সপ্তাহ আমাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়। আর এই ঝুঁকি লাঘবের ক্ষেত্রে একটি গুরুতর উভয়সংকট রয়েছে। মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে, একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকেও গুরুতর বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হবে। উভয় লক্ষ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন অতি সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনা; পরিকল্পনা প্রণয়নে ও তা বাস্তবায়নে এমন ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্থনীতির ক্ষতি ন্যূনতম মাত্রায় সীমাবদ্ধ রেখে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়। কেননা শুধু অর্থনৈতিক বিবেচনাই যেন মুখ্য হয়ে না দাঁড়ায়। অর্থনীতি রক্ষার তাগিদে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এতে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে এবং আরও বাড়বে। সেই ঝুঁকি শুধু করখানাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, শ্রমিকদের বাসস্থান ও লোকালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি প্রতিটি পোশাক কারখানার সবার মেনে চলা নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মানসম্মত মাস্ক ও গ্লাভস পরে কাজ করতে হবে। প্রতিটি কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এটা নিশ্চিত করতে হবে; তাদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নজরদারির প্রয়োজন হবে। কোনো পক্ষেই কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত সারাবিশ্বে এক শ্লোগান: সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, ঘরে থাকুন নিরাপদে থাকুন। আমাদের দেশের মানুষকে ঘরে নিরাপদে রাখতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হয়েছে, এবং তা গত ৩০ মে পর্যন্ত বলবৎ ছিল। আর এই সাধারণ ছুটির পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এই দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য নানান পদপে গ্রহণ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনকল্পে ব্যবসায়ীদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। সারাদেশে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডাক্তারদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। গরীব দুঃখী মেহনতি মানুষদের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্য বিতরণ করেছেন। আবার ৫০ লক্ষ মানুষের জন্য ঈদের খুশি উদ্যাপিত করতে মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও গৃহহীনদের আশ্রয় নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়ি নির্মাণ প্রকল্প অব্যাহত রেখেছে এবং মসজিদ-মাদরাসার মৌলভী সাহেবদের জন্য অনুদান প্রকল্পসহ নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং গৃহীত এই পদক্ষেপগুলো দেশ-বিদেশে প্রশংসনীয় হয়েছে। তার পরেও মানুষকে ঘরবন্দি রাখা যায়নি। নানান কারণে ও অজুহাতে ছুটছে মানুষ এদিক থেকে ওদিক। মূলত অস্বীকার করার উপায় নাই এই দুর্যোগের কারণে গৃহবন্দি অধিকাংশ মানুষ আজ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। রুটি রোজগার বন্ধ হয়েছে গেছে। চরম হতাশায় দিন পার করছে এবং অনিশ্চিত আগামীর প্রত্যাশায় আরও হতাশার আঁধার ঘনীভূত হচ্ছে।
ঢাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে আর চট্টগ্রাম বর্তমানে করোনার হট জোনে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এ ধরনের এলাকাগুলো থেকে মানুষের অন্যত্র যাওয়া কিংবা অন্য কোনো এলাকা থেকে এসব এলাকায় মানুষের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা দরকার। সে জন্য সর্বোচ্চ সংক্রমিত জেলাগুলোতে পুনরায় লকডাউন করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আর যেসব জেলায় সংক্রমণের হার কম, সেগুলোতে সবকিছু শিথিল করা যেতে পারে। অর্থাৎ এলাকা বাছাই করে ভিন্ন ভিন্ন রকম পদক্ষেপের মাধ্যমে সংক্রমণের বিস্তার রোধ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করতে হবে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনি নিরাপদে থাকলে নিরাপদে থাকবে এই জনপদ, দেশ ও দেশের মানুষ। আসুন নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের না হয়ে ঘরেই থাকি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। আর জীবিকার সন্ধানে গিয়ে যেন জীবনকে বিপন্ন না করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি (বাপউস)।






