কাজী সরোয়ার খান মনজু :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের অবদান কোনো দলীয় পরিচয়ের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। তাঁরা তাঁদের কর্ম, সততা, প্রজ্ঞা ও জনকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে জাতির সম্পদে পরিণত হয়েছেন। মরহুম (ইঞ্জিনিয়ার আবুল হাসনাত লুৎফুল কবির সিদ্দিকী) এল. কে. সিদ্দিকী ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মেধাবী প্রকৌশলী, দক্ষ প্রশাসক, বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং সর্বোপরি নৈতিক নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৩৯ সালের ১৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি সততা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সমাজসেবার আদর্শে গড়ে ওঠেন। সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বের গুণাবলির পরিচয় দিয়ে ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবনের শুরু এবং পরবর্তীকালে জাতিসংঘের অধীনে লিবিয়ায় আবাসন প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন—এই উপলব্ধি তাঁর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতের প্রতিমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি পরিচিত ছিলেন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, নৈতিক দৃঢ়তা এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের জন্য।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি সহজ কিন্তু গভীর বিশ্বাস রাজনীতি ক্ষমতা ভোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের কল্যাণে দায়িত্ব পালনের একটি মহৎ অঙ্গীকার। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন সাদাসিধে, সংযমী এবং নীতিতে অটল। জনসেবা ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি কখনো নিজের জন্মভূমি মুরাদপুরকে ভুলে যাননি। শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা ছিল অব্যাহত। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে গ্রামের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ কারণেই তিনি স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন এবং উন্নয়নের প্রতিটি উদ্যোগে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
আজকের বাংলাদেশে যখন সুশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা এবং জনআস্থার প্রশ্ন নতুন করে আলোচিত হচ্ছে, তখন ইঞ্জিনিয়ার এল. কে. সিদ্দিকীর জীবন ও কর্ম আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। তিনি দেখিয়েছেন, সততা ও দক্ষতা একসঙ্গে ধারণ করেই রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হওয়া সম্ভব। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদে নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য তাঁর জীবন এক অনন্য অনুপ্রেরণা। প্রযুক্তিগত জ্ঞান, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনকল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার—এই চারটি গুণের সমন্বয়েই একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক গড়ে ওঠেন। ইঞ্জিনিয়ার এল. কে. সিদ্দিকী সেই বিরল উদাহরণগুলোর অন্যতম।
২০১৪ সালের ১ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ, কর্ম এবং মূল্যবোধ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি চলে যান, কিন্তু আদর্শ থেকে যায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন যত বাড়ছে, ততই তাঁর জীবন ও দর্শনের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই কৃতী সন্তানকে।
লেখক, গণমধ্যামকর্মী ও
সাবেক দপ্তর সম্পাদক
জাসাস চট্টগ্রাম উত্তর জেলা।






Discussion about this post