পান্তা ভাতের জল,তিন পুরুষের বল
পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল কথাটি অনেক আগে শুনেছি আজ মনে হচ্ছে কথাটি একেবারে অসত্য
নয় অন্যদিকে ১লা বৈশাখে পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ খাওয়ার যে প্রচলন বর্তমানে দেখা যায় যা ব্যাপক হারে দিনদিন বাড়ছে তা আদৌ বাঙ্গালি সংস্কৃতি নয় এটি একটি দুষ্টচক্র কর্তৃক আরোপিত অপসংস্কৃতি মাত্র।
পান্তাভাত আমার নিকট অনেক জনপ্রিয় একটি খাবার জীবন সংগ্রামে গ্রামে কিছু সময়কাল অবস্থান করার কারনে কালে ভ্রদ্রে পান্তা ভাত যে খাইনি তা কিন্তু নয়।গত ৩৫ বছর খেয়েছি কিনা তা ঝাপসা বটে, ঝকঝকে পরিস্কার ও নয়। ১লা বৈশাখ এলে অনেকে পান্তা ইলিশ খায় যা আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি নয় কখনও ছিল না এ ধরনের কর্মকান্ড কোন সংস্কৃতি জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের যা মোঠেই করা উচিত নয়।
অনেকের মতে আশির দশকের শেষ দিকে জোর করে কিছু উচ্চ বিলাসী, সংস্কৃতি ভন্ড এটিকে বাঙ্গালির অন্যতম সংস্কৃতির একটি অংশ হিসাবে আমাদের নিকট উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।
এককথায় এটি একটি লজ্জাজনক আরোপিত সংস্কৃতি মাত্র।
আমরা জানি, সংস্কৃত, পানীয় > পানি > পানি + তা > পানিতা > পানতা । পানতাকে ভাত সংরক্ষণের একটা পদ্ধতি ও বলা যায়।অনেক গ্রামে এখনও উচুঁ কানা যুক্ত থালা ও দেখা যায় যাকে পানতি বলা হয় যা মুলত একটি দেশী শব্দ।
বিশ্বব্যাপী জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নয়ন ও তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যা মানুষ এখন ভুলতে বসেছে আবার আমাদের দেশের অনেক জায়গায় এখনো সকালের নাস্তা হিসাবে অনেকে পান্তা ভাত খেয়ে থাকে। ছোট বেলায় আমার নিজ গ্রামে দেখেছি, পান্তা ভাত খাওয়ার সময় খাবার গ্রহীতা পান্তা ভাতের সাথে পোঁড়া লাল মরিচ বা কাঁচা মরিচ সাথে, দু,এক টুকরা পিয়াজ নিয়ে মনের সুখে পান্তা ভাত খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতো। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন মৌসুমে অন্য জেলা থেকে কাজ করতে আমাদের এলাকায় আসতো তাদের কে তিন বেলা ভাত খাওয়ানোর পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট হারে পারিশ্রমিক ও দেয়া হতো। সেই ক্ষেত্রে সকালে পান্তা ভাত তাদের জন্য বাধ্যতা মুলক ছিল।
দূর্ভাগ্যজনক হলে সত্য,আজ কাউকে তেমন পান্তা ভাত খেতে দেখি না, আমি নিজে ও খাই না, কখন খেয়েছি তাও ভালোভাবে মনে পড়ে না।
বাঙ্গালী কখন থেকে এই পান্তা ভাত খাওয়া শুরু করে এখনও সঠিক ভাবে তার দিন কাল সংখ্যা সঠিক ভাবে আমি জানতে পারেনি তবে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘ চণ্ডীমঙ্গল ’ কাব্যে লিখে গেছেন, ‘বাসি পান্তা ভাত ছিল সরা দুই তিন’ তার বই পড়ে পরে জেনেছি।
১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত বিজয় গুপ্তের মঙ্গলকাব্যে তিনি ও লিখেছিলেন ‘আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তা ভাত’। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন বাংলার জল হইতে জেলে,মদ হইতে মোদো পানি হইতে পানতা, নুন হইতে নোনতা।
সে ই যাই হোক, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম পানতা ভাতে প্রায় ৭৪ মিলি গ্রাম লোহা থাকে যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে থাকে মাত্র ৩.৪ মিলি গ্রাম লোহা । এছাড়াও ১০০ গ্রাম পানতা ভাতে পটাশিয়াম এর পরিমাণ বেড়ে হয় ৮৩৯ মিলি গ্রাম ও ক্যালশিয়াম এর পরিমাণ বেড়ে হয় ৮৫০ মিলি গ্রাম যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে ক্যালশিয়াম থাকে মাত্র ২১ মিলি গ্রাম।
এছাড়া পানতা ভাতে সোডিয়াম-এর পরিমাণ কমে হয় ৩০৩ মিলি গ্রাম যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে সোডিয়াম থাকে ৪৭৫ মিলিগ্রাম।তাছাড়া পানতা ভাত খাওয়ার ফলে অন্ত্র নালিতে উপস্থিত প্যানক্রিয়াটিক অ্যামাইলেজ সহ আরও কিছু এনজাইম- এর কার্যকারিতা বহু গুণ বেড়ে যায় এর ফলে পানতা ভাতে উপস্থিত অলিগোস্যাকারাইড সহ আরও কিছু জটিল শর্করা খুব সহজেই হজম হয়ে যায়।
পান্তাভাত হাড়ের ক্ষয়রোধ করে। তাহা ছাড়া এতে ভিটামিন বি-২৬ এবং ভিটামিন বি-১২ ও থাকে। পানতা ভাত খেলে শরীর হালকা থাকে এবং যে কোন কাজে বেশি শক্তি পাওয়া যায়।
পান্তা ভাত মানে আগে জল দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়। ভাতে জল দিয়ে রাখলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট ভাতের শ্বেতসারকে গাঁজিয়ে ইথানল, ল্যাকটিকঅ্যাসিড তৈরি করে।
ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হওয়ার ফলে পানতা ভাতের অম্লতা অনেক বেড়ে যায় যার ফলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক পান্তা ভাত নষ্ট করতে পারে না।আমরা অনেকে জানি, ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাস, নবাব আলিবর্দি খানের সদ্য মৃত্যুর পর তাঁর পৌত্র সিরাজ দ্দৌলা জাঁকিয়ে বসেন মুর্শিদাবাদ দরবারে।
প্রথম থেকেই সিরাজ ছিলেন ইউরোপ তথা বৃটিশ বিরোধী অন্যদিকে বাংলা তথা ভারতের বুকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব এতই বাড়তে থাকে যার ফলে মুর্শিদা বাদে, ই বন্দি হন হেস্টিংস সহ বেশ কিছু ব্যবসায়ী। কথিত আছে, বাংলার আইঢাই গরমে ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হেস্টিংসকে কলাপাতায় পান্তা, ভাজা চিংড়ি এবং কাঁচা পেঁয়াজ খাইয়ে ঐ সময়ে তার প্রাণরক্ষা করা হয়েছিল।শহুরে বাঙালিরা বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে যখন থেকে উদযাপন করা শুরু করতে থাকে তখন থেকে ও পান্তার সঙ্গে ইলিশের যোগসূত্রের বিষয়টি জানা যায়নি।
আসুন, আমরা পান্তা ভাত খাবো, ১লা বৈশাখে বা অন্য যে কোন সময় তবে ১লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমরা পান্তা ইলিশ খাবো না, প্রয়োজনে আলু ভর্তা,তরতাজা ধনিয়া পাতা দিয়ে পিয়াজ চাটনি খাবো যা আমার আপনার ১লা বৈশাখ উদযাপন কে সত্যিকার অর্থে আনন্দময় ও স্মরনীয় করে তুলবে।
লেখক —
মোঃ কামরুল ইসলাম।
কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।







Discussion about this post