মাওলানা এম সোলাইমান কাসেমী :
ক্ষমা ও বিনয়ের মাধ্যমেই মানুষের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমা করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ক্ষমা লাভ ও ভালোবাসা পাওয়া যায়। রাগ সংবরণ, ক্ষমা ও বিনয় একটি ইবাদত। ক্ষমা করার মনোভাব না থাকায় সমাজে প্রতিনিয়ত চলছে হানাহানি, গুম ও খুন। ফলে সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। সমাজ-সংসারে অশান্তি সব সময় লেগেই আছে। এমনকি সংসারে ভাঙন ও হত্যার মতো ভয়ংকর ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। মহানবী (সা.) ছিলেন দয়া-মায়া ও ক্ষমার প্রতীক। প্রতিশোধ গ্রহণের অবারিত সুযোগ পেয়েও তিনি ক্ষমা ও দয়া দেখিয়েছেন সারাজীবন। শত্রুদের ক্ষমার অযোগ্য অনেক অপরাধকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন পরম উদারতায়। ক্ষমা এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা ঘোরতর শত্রুকেও আপন বানিয়ে দেয়।যিনি উদারপ্রকৃতির, তিনিই ক্ষমাশীল। যাদের এ ধরনের গুণাগুণ রয়েছে, তারা আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামতপ্রাপ্ত। ক্ষমাকারী ধৈর্যবান ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।
মহান আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। যে অন্যকে ক্ষমা করে তাকেও ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সম্বরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ অন্যের রূঢ় বা কটু কথাবার্তা কিংবা অশোভনীয় আচার-আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন। ফলে একে অপরে মতবিরোধ তৈরি হয়। অনেক সময় মতবিরোধ ও মতানৈক্যকে কেন্দ্র করে পরস্পরের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে আদেশ দিয়েছেন, যেন একে-অপরকে ক্ষমা করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা ভালো কিছু প্রকাশ করো কিংবা গোপন করো অথবা মন্দ ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, ক্ষমতাবান। ’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৯)।
ক্ষমা করলে কারও মর্যাদা কমে না। বরং বহু গুণে ক্ষমাশীল ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন করেছেন, সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে, তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। উদারতা ও সহিষ্ণুতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কোমলতা ও হৃদয়ার্দ্রতা মুমিনদের বিশেষ একটি গুণ। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন সাহাবি মুয়াজ (রা.) ও মুসা (রা.)-কে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন ও আদেশ দেন, ‘লোকদের প্রতি কোমলতা করবে, কঠোরতা করবে না, তাদের সুখবর দেবে, ঘৃণা সৃষ্টি করবে না। পরস্পর একমত হবে, মতভেদ করবে না। ’ (বুখারি, হাদিস: ৩০৩৮)। পরিবারিক, সামাজিক ও জীবনের অন্যান্য পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এমন হলে, মুসলমান হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়া। পারস্পরিক ভুল-ত্রুটিগুলোকে শুধরে দেওয়া। এতে সম্পর্ক ও বন্ধন আরো মজবুত ও অটুট হয়।
হিংসা, অহঙ্কার, ক্রোধ, জিদ, রাগ কিংবা উত্তেজনা মানুষকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু কাউকে ক্ষমা করলে কিংবা কারো প্রতি উদারতা প্রদর্শন করলে, আল্লাহতায়ালা জগৎ সংসারে ওই ক্ষমাশীল ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।ক্ষমাশীলতার গুণে গুণান্বিত হয়ে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়। ক্ষমা করা কিংবা উদারতা দেখানো একটি স্বর্গীয় গুণ। ক্ষমাশীল ব্যক্তিই হলো- সর্বোত্তম সবরকারী। যে ক্ষমা করেন, তিনি ধৈর্য ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহতায়ালা নিজে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল বলে, তিনি ক্ষমাশীল ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। মহান আল্লাহতায়ালা অতিশয় ক্ষমাশীল, মহাক্ষমাশীল। বান্দা জেনে অথবা না জেনে যত বড় অপরাধই করুক না কেন আল্লাহ গাফুরুর রাহিমের কাছে ফিরে এলে তিনি ক্ষমা করে দেন। তিনি বান্দাদের ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখেন। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই হতাশায় নিমজ্জিত নয়, সর্বাবস্থায় ভরসা রাখতে হবে আল্লাহ গাফুরুর রাহিমের ওপর। তিনিই আমাদের শেষ আশ্রয়, তার দরবারই আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।







Discussion about this post