নিউজ ডেস্ক : মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার একটি অপরিহার্য দিক। এটি একটি পরিষ্কার মুখ বজায় রাখা এবং দাঁতের সমস্যা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে সমস্ত অনুশীলনকে অন্তর্ভুক্ত করে। নিয়মিত ব্রাশিং, ফ্লসিং এবং ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া মৌখিক স্বাস্থ্যবিধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। মুলত ব্যাক্টেরিয়া শারীরবৃত্তিয়, বিপাকীয় কাজের জন্য এনজাইম নিঃসরণ করে যা প্রোটিওলাইটিক অ্যাসিডিন্ট প্রকৃতির হয় যা দাঁতের গোড়ায় বা এনামেলের উপর ফিসার বা খাঁজের মধ্যে সঞ্চিত হয়। যা এনামেলের ক্ষতিসাধন করে বা গর্তের সৃষ্টি করে। পরে ঐ গর্তে আরো খাদ্যবস্তু জমতে থাকে বা ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম ঘটে যা আরো বেশি হতে প্রোটিওলাইটি এনজাইম ছড়াতে থাকে যা অধিক এনামেল এবং ডেন্টিনের ক্ষয় সাধন করে এবং ক্ষতসাধন গর্তকে বৃহৎ আকারে পরিণত করে। এছাড়াও অনেক সময় মুখ অভ্যন্তরের মিউকাস মেমব্রেনের উপর, মাড়িতে, গোড়ায়, জিহ্বাতে প্যাথোলজি সৃষ্টি করে, ঘা হয়, দাঁতের গোড়া ফুলে ওঠে, মাড়ি হতে রক্ত পড়ে, গোড়া আপশ হয়, পেরিওডন্টাল লিগামেন্টের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে, মুখ হতে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। অনেক সময় ঐ সঞ্চিত খাদ্যবস্তুর উপর জলের খনিজ পদার্থ এবং মুখের অভ্যন্তরস্থ লালা মিশ্রিত হয়ে ডেন্টাল টার্টার বা ক্যালকুলাস সৃষ্টি করে যাকে এক কথায় পাথুরী বলে। অনেক সময় বৃহৎ আকারের পাথুরী দাঁতের গোড়ায় জমে থাকতে দেখা যায়। এই পাথুরী দাঁতের রোগের আরেকটি কারণ।এই সকল রোগ বা যন্ত্রণা হতে মুক্ত হওয়ার জন্য ওরাল হাইজিন ঠিকমত বজায় রাখা প্রয়োজন। আর সেই জন্য নিম্নলিখিত নিয়ম পালন করতে হবে। ব্রাশ করার সময় নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অর্থাৎ ৪৫০ বা হেলাইয়া উপর হতে নিচের দিকে এবং নিচের হতে উপরের দিকে একই পদ্ধতিতে ভিতরের দিকে এবং বাহিরের দিকে ব্রাশ করতে হবে। এই সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে ব্রাশের হাতল যেন দাঁতের এনামেলের সাথে ঘষা না খায়।নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে দাঁত ব্রাশ করার পরও যদি খাদ্য বস্তু দাঁতের কোনো জায়গায় আটকিয়ে থাকে তবে তা টুথপিক্ বা দাঁতখোঁটা (স্টেরিলাইজ) দিয়ে বের করতে হবে।দাঁতের ক্রাউন যদি ক্ষয় হয়ে যায় তা হলে সেখানে ক্রাউনিং করাই ভালো। সেক্ষেত্রে জ্যাকেট ক্রাউনিং (স্টিল বা সিরামিক) যেখানে পার্শ্ববর্তী মিসিং দাঁত আছে সেখানে ব্রিজ ক্রাউনিং করাই ভালো।গর্ত বা ক্যাভিটি যুক্ত দাঁতের ক্ষেত্রে সিল বা ফিলিং করা উচিত। ইনফেক্টের পালপ্ চেম্বারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আর.সি.টি. করা করতে হবে।প্রত্যেক দিন নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন। ব্রাশ ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে যেমন- আঙ্গুলদিয়ে, গাছের ডাল দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা উচিত নহে। এতে দাঁতের এনামেল ও মাড়ি ক্ষয় হয়। আঘাতজনিত ক্ষত বা আলসারের সৃষ্টি হয়।দাঁত ব্রাশ করার জন্য নির্দিষ্ট মেডিকেটেড পেস্ট বা পাউডার ব্যবহার করতে হবে। অন্যকোন অবৈজ্ঞানিক দ্রব্যবস্তু দ্বারা দাঁত ব্রাশ করা উচিত নয়।খাদ্য বস্তু গ্রহণের ১০ মিনিট কাল সময়ের মধ্যে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। খাদ্য গ্রহণের আগে নয়। চটে আঠাল খাদ্যবস্তু গ্রহণ করলে ভাল করে মুখ ধৌত করা প্রয়োজন না হলে অবশ্যই ব্রাশ করতে হবে।প্রতিদিন একবার ব্রাশ করাই যথেষ্ট এবং খাদ্য গ্রহণের পর শয়নের পূর্বে। তবে ঐ ব্রাশ করার পর আর কোন দ্রব্য খাদ্য হিসাবে গ্রহণ না করা বা ধূমপান না করা।
মুখো গহবরের যদি স্বাস্থ্য ঠিক না থাকে বা পরিচর্যা যদি ঠিকমতো করা না হয় তাহলে মুখ অভ্যন্তরের মিউকাস মেমব্রেন নরম মাংস পেশী দাঁতের গোড়ায় জিনজিভা মাড়িতে নানা প্রকার জীবাণু সংক্রমণ হতে বা প্যাথলজিকেল পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবর্তন হতে দেখা যায়, এবং বিভিন্ন রোগ এবং তার উপসর্গ প্রকাশ পেতে থাকে। খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের পর ঠিকমতো পরিস্কার না করলে বা ব্রাশ যদি নিয়মমাফিক না হয় বা দাঁতের গোড়ায় লুকানো খাদ্য বস্তু কণাবের করা না হলে মুখ গহব্বর বা দাতের সকল রোগের সূত্রপাত ঘটে। কারণ লুকানো খাদ্যবস্তু কনার ওপর ১০ মিনিট কাল পর হতে জীবাণু অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ এবং বংশবিস্তার হতে থাকে এই জীবাণুগুলির মধ্যে ল্যাক্টোব্যসিলাস, স্টেপটোকক্কাস, স্টাফাইলো কক্কাস, ক্যান্ডিডিয়া, মনিলিয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই ব্যাকটেরিয়া শরীরবৃত্তিময় বিপাকীয় কাজের জন্য এ্যানজাইম নিঃসরণ করে। যা প্রোটিওলাইটিক এসিডিক প্রকৃতির হয়ে রাতে দাঁতের গোড়ায় গোড়ায় বা এনামেলের উপর ফিশার বা খাজের মধ্যে সঞ্চিত হয়। তাই সকলের জন্য মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি কেন গুরুত্বপূর্ণ ? এই বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্ঠা করছি যা সহজেই অনুধাবন করা যায় । যেমন : দুর্বল মৌখিক পরিচ্ছন্নতার কারণে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে গহ্বর, মাড়ির রোগ (জিনজিভাইটিস এবং পিরিয়ডোনটাইটিস), এবং দাঁত ক্ষয়। নিয়মিত পরিষ্কার করা প্লাক অপসারণ করতে সাহায্য করে, ব্যাকটেরিয়াগুলির একটি আঠালো ফিল্ম যা দাঁতের উপর তৈরি হয়, এটি টারটারে শক্ত হতে বাধা দেয়।আর মুখ হল শরীরের প্রবেশদ্বার, এবং মৌখিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণা খারাপ মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি এবং হৃদরোগের মতো সিস্টেমিক অবস্থার মধ্যে যোগসূত্র দেখিয়েছে, ডায়াবেটিস, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, এমনকি ডিমেনশিয়া। ভাল মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির ঝুঁকি কমাতে পারে।এছাড়াও মুখের দুর্গন্ধ (হ্যালিটোসিস) খারাপ মৌখিক পরিচ্ছন্নতার ফলে হতে পারে, যা বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে পরিচালিত করে। সঠিক ব্রাশিং এবং ফ্লসিং খাবারের কণা এবং ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে যা দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে, তাজা নিঃশ্বাসের প্রচার করে।এবং এর ফলে আত্মসম্মান বাড়ায়।কেননা একটি সুস্থ হাসি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ভাল মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি সাদা দাঁত এবং স্বাস্থ্যকর মাড়িতে অবদান রাখে, ইতিবাচকভাবে আপনার স্ব-চিত্র এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।সুতারাং ভাল মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌখিক যত্নের গুরুত্ব বুঝতে এবং কার্যকর অনুশীলন এবং ঘরোয়া প্রতিকার প্রয়োগ করে, আপনি একটি স্বাস্থ্যকর মুখ, একটি উজ্জ্বল হাসি এবং উন্নত সামগ্রিক স্বাস্থ্য উপভোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময়ই ভালো, তাই আপনার যত্ন নেওয়া শুরু করুন । ওরাল হাইজিন বা মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি আজ এবং আগামীর একটি সুস্থ সুন্দর স্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিসীম অ বদান রাখতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক কলামিষ্ট ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী, সভাপতি – বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশন।







Discussion about this post