হাওয়া মহল ও নানা কথা।
ভারতের সুন্দর মনোরম শহর হচ্ছে জয়পুর। জয়পুরে হাওয়া মহলের এর অবস্থান। লাল,গোলাপী বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত যা স্বচক্ষে দেখা। আজমির শরিফ ও কর্ম যজ্ঞ শেষ-আমরা বের হলাম রাজস্থানের উদ্দেশ্য। রাজ স্থানের পিংক সিটি,হাওয়া মহল, জলমহল,যন্তর মন্তর সহ নানা দর্শনীয় স্থান দেখা ও সেই মোগল সময়ের শাসন আমল, নির্মান কৌশল, রাজনীতি, অর্থনীতি সহ সামরিক কৌশল জানা ও নানান ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া ছিল আমার দর্শনের মুল উদ্দেশ্য।
জানা যায়, হাওয়া মহল নির্মাণ করেন মহারাজা সওয়াই প্রতাপ সিং এটি ১৭৯৯ সালে নির্মিত হয়েছিল। হাওয়া মহল,যা “বাতাসের প্রাসাদ” নামেও পরিচিত,এটি একটি স্থাপত্যিক বিস্ময়। এই পাঁচতলা প্রাসাদটি তার অনন্য নকশার জন্য বিখ্যাত, যেখানে ৯৫৩টি ছোট জানালা (ঝারোখা) রয়েছে।
আমরা সে সময় ৩ বন্ধু সুজন,টিপু প্রাসাদের এক পাশে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় সেই সময়ের তোলা ছবি। ছবিটি কে তুলেছে আজ মনে পড়ছে না তবে এই ক্ষেত্রে গাড়ীর চালকের সম্ভবনা বেশি।
ভবনটি -কক্ষগুলো বাতাস চলাচলের জন্য বিশেষভাবে তৈরী করা হয়েছে, যার ফলে গ্রীষ্মকালে প্রাসাদটি খুব শীতল থাকে। শুনা যায়,এ ভবনটি ঐ সময়ের রাজকীয় মহিলাদের জন্য নির্মিত হয়েছিল, যাদের জনসম্মুখে আসার সুযোগ ছিলনা বলে তারা যেন ৯৫৩ টি জানালা দিয়ে রাজস্থান-জয়পুর সহ এই দুনিয়ার সৌন্দর্য দেখতে
পারেন। গাড়ীর চালককে আমি জিজ্ঞেস করায় তিনি বলছেন এই টি মান সিংহের বাসভবন। আমাকে কোন ভাবে খুশি করার চেষ্টা করেন আমি তা পরে জেনেছি।
এর পর পর, ই জানলাম এটি হাওয়া মহল,তখন তাকে আমি আর লজ্জা দেয়নি,প্রয়োজন মনে করেনি।
জানা যায়,মোগল সেনাপতি মানসিংহের কোনো নির্দিষ্ট বাসভবন ছিল না। তিনি বাংলা,জয়পুর রাজস্থান এবং অন্যান্য অঞ্চলে বেশ কিছু স্থান পরিদর্শন করেছেন ও ঐসব স্থানে তিনি অবস্থান করেছেন।
সেই দিক বিবেচনা তিনি এখানে এসেছিলেন ও অবস্থান ও করে ছিলেন তখন এই হাওয়া মহল ছিল না। তিনি ১৫৯৫ থেকে ১৬০৬ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে বাংলার গভর্নর ছিলেন তখন বেশ কিছু দুর্গ ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন এটি সত্য।
তিনি ২১ শে ডিসেম্বর, ১৫৫০ জম্ম গ্রহন করেন আর ৬ই জুলাই, ১৬১৪ মৃত্যু বরন করেন।তিনি ছিলেন রাজা ভগবান দাসের পালিত পুত্র। অম্বর এই জন্মগ্রহণ কারী মীর্জা রাজা হিসেবে পরিচিত মানসিংকে সম্রাট আকবর ফরজন্দ(পুত্র)খেতাবে ভূষিত করেন।তাকে ১৫৯০ সালে ‘রাজা’ খেতাব এবং পাঁচ হাজারি মনসব প্রদান করা হয়েছিল। আরো জানা যায়,মোগল সেনাপতি মানসিংহ রাজস্থানের আমের রাজ্যেও বসবাস করতেন।
কর্ম জীবনে তিনি এবং বিভিন্ন স্থানে সে বিভিন্ন জায়গা অবস্থান করতেন।
জানা যায়,রাজা মানসিংহ ১৫৯৫ সালে রাজস্থান থেকে তার রাজধানী টোক নগরীতে স্থানান্তরিত করেন। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে টাঙ্গাব গ্রাম ও টোক নগর অবস্থিত ছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে ঈসা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দু অবস্থিত ছিল।
আমরা জানি ময়মনসিংহ শব্দের আভিধানিক অর্থ “ময়ূরের আবাসভূমি” বা “ময়ূরনগর” তবে, ময়মনসিংহ নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিকমত প্রচলিত আছে।কেউ কেউ মনে করেন, সম্রাট আকবরের সেনাপতি মান সিংহের নাম থেকে ময়মনসিংহ নামের উৎপত্তি হয়েছে, আবার কারো কারো মতে, মোগল আমলে ” মমিনশাহী” থেকে ” ময়মনসিংহ” নামের উদ্ভব হয়েছে। মানসিংহের বংশধররা এখন ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছেন জেনেছি। তারা কোন জেলায় বসবাস করেন তা আমি জানতে পারেনি।
২০১০- আমাদের দর্শনের পূর্বে জানা যায়,আনুমানিক ৪৫৬৫ মিলিয়ন টাকা খরচে স্মৃতিস্তম্ভটি উজ্জ্বল করার নিমিত্তে নকশা ঠিক রেখে পূনঃ কাজ করা হয়।এটি পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভবন।যে কেউ পরিদর্শনে গেলে তা সহজে দেখতে পাবে।
আপনি পরিদর্শনে গেলে দেখবেন যে, মহলের সবচেয়ে উপরের তিনটি তলা এককভাবে একটি করে কক্ষ দ্বারা গঠিত, নিচে প্রথম ও দ্বিতীয় তলার সামনে উন্মুক্ত স্থান আছে, যা প্রাসাদের পূর্ব অংশে তৈরি হয়েছে। প্রাসাদের সম্মুখভাগের অংশ, যাহা প্রাসাদের সামনে প্রধান রাস্তা থেকে মৌচাকের মত দেখায়।
সম্মুখ ভাগের প্রতিটি অংশে ছোট দরজা এবং সুন্দর বেলে পাথরের জানালা, ফিনিয়াল ও গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে।
মজার ব্যাপার প্রতিদিন সকালে প্রাসাদটি সূর্যোদয়ের সুবর্ণ আলোকে আলোকিত হয়। আমরা বিকেলে দর্শন করার কারনে সে সৌন্দর্য দেখেনি।
হাওয়া মহল হতে জলমহলের দুরত্ব তেমন নয় বলে মনে হয়েছে। পানির মাঝখানে বিশাল প্রাসাদ। চারিদিকে পাহাড় দেখেছি। প্রাসাদে যেতে হয় নৌযানে সময়ের স্বল্পতায় আমরা লেকের পাশ থেকে দেখেছি।
এটি ‘জলের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত। জলমহল দেখতে চাইলে যেতে হবে আপনাকে ভারতের রাজস্থানের জয় পুরে অবস্থিত পিংক সিটিতে।
আমরা পিংক সিটির সৌন্দর্য উপভোগ করেছি,দেখেছি রাজ্যের নানা দর্শনীয় স্থান ও।
জলমহল যে লেকের মাঝখানে স্থাপিত তার নাম মান সাগর।জানা যায়, মানুষের পানিসংকট দূর করতে লেক টি তৈরি করেছিলেন রাজা মান সিং। ১৬১০ সালে হঠাৎ ভয়ানক খরা আর দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে দ্রুত বারবতী নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির ব্যবস্থা করেন মান সিং। তৈরি করা হয় বিশাল এক লেক। যার নাম দেন মান সাগর। লেকের ওপর জলমহল বানানোর পরও এর খুব বেশি রকমফের হয়নি।
১৮ শতকে জলমহল নির্মাণ করেছিলেন মহারাজ মাধো সিং। এই প্রাসাদের মালিকানা পরে পান মাধো সিংয়ের ছেলে দ্বিতীয় মাধো সিং।
বাবার প্রাসাদকে অবশ্য খুব একটা বাড়াননি তিনি। প্রাসাদের সঙ্গে শুধু একটা বিচারালয় যোগ করে ছিলেন। জলমহল তৈরি হয়েছিল মাধো সিংয়ের হাঁস শিকারের জন্য। মাঝেমধ্যে নৌকায় করে হাঁস শিকারে আসতেন তিনি। থাকার কামরা নেই,তবে বিশাল একটি চত্বর রয়েছে এই প্রাসাদে।
চারপাশে পানি থাকায় একে এক তলা মনে হতে পারে। তবে জানা যায়,জলমহল পাঁচতলা।
নিচের চারটি তলাই বছরের বেশির ভাগ সময় পানির নিচে ডুবে থাকে।এসব নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলে থাকে আমার যা মনে হয়েছে তা হলো,এই সব দর্শনীয় স্থান সমুহ এই সব অঞ্চলের অতীত, ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষ কে বারবার জানান দেয়।ভ্রমনের নানা ছবি ব্যক্তি গত এলবামে রক্ষিত আছে।
এখন তো আর কেউ ক্যামেরা ব্যবহার করেনা।ভাবছি সেই সময়ে স্মৃতি হিসাবে রেখে দেয়া ৩ টি ক্যামেরা ও নিলামে তুলতে হবে।সেই যাই হোক,সম্ভব হলে আপনি স্বপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন।
লেখক- মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম।
কবি,প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকারকর্মী।







Discussion about this post