হেপাটাইটিস লিভারের এক ধরনের প্রদাহ। লিভার বা যকৃতের প্রদাহ সৃষ্টি করে এমন দুটি ভাইরাস হলো হেপাটাইটিস-বি এবং সি। এ দুই ভাইরাসকে নীরব ঘাতক বলা হয়। ৯০ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও তা জানতে পারে না। তাই এই রোগ প্রতিরোধে সবার আগে দরকার জনসচেতনতা তৈরি করা।
হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে ভয়ের কিছু নেই। এই রোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেশেই আছে। এই রোগের বিশ্বমানের ওষুধ দেশের কোম্পানিগুলো উৎপাদন করছে।গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে দৈনিক সমকালের সভাকক্ষে ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৫: আসুন হেপাটাইটিস রুখে দেই’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় লিভার রোগ বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এ উপলক্ষে অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশ (এএসএলডিবি) এবং সমকাল এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
আলোচনার শুরুতে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, হেপাটাইটিস নিয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য শুরুতে জানতে হবে, এই ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়। এটি রক্ত বা শরীরের নির্গত তরল থেকে ছড়ায়। আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে সন্তান সংক্রমিত হয়। পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না– দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এমন কোনো যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। চুল কাটার স্যালুনে একই ব্লেড একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে সেখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। শরীরে ট্যাটু আঁকার সময় ছড়াতে পারে। অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণেও এটি ছড়াতে পারে। কাটাছেঁড়া রোগীর সংস্পর্শে এলেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, জীবনে একবার হলেও হেপাটাইটিস-বি এবং সি ভাইরাসের পরীক্ষা করা। মায়েদের ক্ষেত্রে একজন পরীক্ষা করলেও দুজনের জীবন নিরাপদ হয়। নবজাতককে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা নেই।
সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও এএসএলডিবির সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, অবস অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, এএসএলডিবির সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, সহসভাপতি ডা. মো. গোলাম আযম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. এ বি এম শাকিল গনি। এ ছাড়া ডা. মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক, ডা. সাইফুল ইসলাম, ডা. মো. শাহেদ আশরাফ, ডা. মো. আসাদুজ্জামান, ডা. মোহাম্মদ কামরুল আনাম, ডা. সৈয়দ আবুল ফয়েজ এবং ডা. মো. হারুন আর রশীদ বক্তব্য দেন। আলোচনায় অংশ নেন এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন।
অধ্যাপক শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস বি রক্ত, সুঁই ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। টিকা নিলে এটি আর ছড়ায় না। ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সারাজীবন চিকিৎসা নিতে হয়, যা ব্যয়বহুল।
ডা. শাহিনুল আলম বলেন, বিদ্যালয়, অফিস-আদালতে একসঙ্গে ওঠাবসা, খাওয়া-দাওয়া, পরিবারের একাধিক সদস্যের একই জামাকাপড় পরা অথবা একই থালাবাটি ব্যবহার করার মাধ্যমে এই ভাইরাসগুলো ছড়ায় না। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
তিনি হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের ওষুধের দাম কমাতে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, জনগোষ্ঠীর যে অংশ এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে আছে, তাদের সংক্রমণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে আগে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে হবে। হেপাটাইটিস নির্মূলে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অধ্যাপক ফিরোজা বেগম বলেন, অন্তঃসত্ত্বা মা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে তাঁর সন্তানেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এটি হলে পরের প্রজন্মও ভাইরাসটি বহন করবে। অ্যাকিউট ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মায়ের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের কিছু আগে থেকে অথবা সন্তান জন্মের প্রথম মাসে সন্তানের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। তবে গর্ভকালীন মাকে টিকা দেওয়া হলে ভবিষ্যতের সন্তান নিরাপদ থাকবে।
ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, শিশু-কিশোররাও হেপাটাইটিস-বি এবং সি-তে আক্রান্ত হতে পারে। তারা আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বি ভাইরাসের জন্য যত ধরনের ওষুধ প্রয়োজন, তা আমাদের দেশেই পাওয়া যায়। আশার কথা হলো, আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো বিশ্বমানের ওষুধ তৈরি করছে। হেপাটাইটিস হলে বা জন্ডিস হলে কবিরাজি ওষুধ সেবন করা ক্ষতিকর।
ডা. এ বি এম শাকিল গনি বলেন, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস লিভার সেলকে নষ্ট করে দেয়। তিন ভাগের দুই ভাগ ক্যান্সারের কারণ হেপাটাইটিস-বি এবং সি ভাইরাস। তাই সবাইকে টিকা নেওয়ার গুরুত্বটা বোঝাতে হবে। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ভয়ের কিছু নেই। রোগীর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া ও মেলামেশায় কোনো সমস্যা নেই– এই বার্তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস পজিটিভ হলে কাউকে চাকরিতে অযোগ্য বলে মনে করা হয়। এটি বিজ্ঞানসম্মত নয়, এটি ভুল পদক্ষেপ। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি থাকবে, এ ধরনের কাউকে যাতে চাকরিতে অযোগ্য বিবেচনা করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে।
ডা. শাহেদ আশরাফ বলেন, হেপাটাইটিসের পরীক্ষাগুলো সরকারিভাবে যে টাকায় করা হয়, প্রাইভেট হাসপাতালেও যেন সমপরিমাণ টাকায় করা হয়। তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এই নির্দেশনা দিতে হবে। তাহলে রোগ নির্ণয় করে সমঝে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন কারণে মানুষ হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হন। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে কিংবা রক্ত নিতে গিয়ে সাধারণত এই ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হন। সঠিক সময়ে এই ভাইরাসের চিকিৎসা করা না হলে পরে জটিলতা দেখা দেয়।
সূত্র : দৈনিক সমকাল।







Discussion about this post